ভাসমান নিশিদিনলিপি

0

বং তখন হয়ত তারা বিচলিত হয়ে থাকবে, কেননা তার মাছের চোখের মতো নরম তুলতুলে শরীরে তখন উত্তেজনা নেই; অথবা ছিল, কিন্তু তা বোঝার বা উপলব্ধির কোনো সূত্র শেষপর্যন্ত আর অবশেষ থাকেনি, আবার এমনও হতে পারে যে, তার সমস্ত অস্তিত্বে নেমে এসেছিল ক্লান্তি- যেমন সূর্য মিশে যেতে থাকে মেঘে আর মেঘে এবং নেমে আসে সন্ধ্যা ও অন্ধকার, কিংবা অন্ধকারের ক্রমপরম্পরা, যেখানে সমস্ত উত্তেজনা স্তিমিত বা আদৌ উত্তেজনাবোধ তাদের স্মৃতি বা স্নায়ুকোষে কোনো প্রকার অনুরণন সৃষ্টির পূর্বমুহূর্তে হারিয়ে যাবার অবকাশ পায় বলে তারা ভেজা শাড়ির মতো নিস্তেজ এবং কেমন যেন একটু হতাশ, কিছুটা বিষণ্ন; হয়ত বা বিষণ্নতা নয়, স্বভাব আর অভ্যাসের কারণে তারা তাকে নিয়ে আনন্দ কিংবা সুখ অনুভব করে না, বরং পরস্পর পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়, যেখানে থকথকে কাদার মতো একটা ভাব থুতনির বাঁকা অংশে ঢেউ তুলে ক্রমশ নিচের দিকে নামতে থাকে এবং তখন তারা হঠাৎ ঝরা শুকনো পাতার উপর দ্রুত পা মাড়ানোর শব্দ শুনতে পায়; ঠিক শব্দ নয়, পাতাগুলো ভেঙে পড়ে, হয়ত পাতাগুলো ভাঙে না, অন্য কিছু; কারণ শব্দটা ঠিক যেন পাতা ভেঙে পড়ার মতো নয়, একটু ক্ষীণ অথচ করুণ, বিলম্বিত; আর এই বিলম্বিত ও চাপা শব্দে তারা সচেতন হয়ে ওঠে ভেতরে ভেতরে, এবং তখন বালকেরা একটু ভীত হয়; ভীত হয় এ কারণে যে, এই বাঁশ আর ডুমুরের কঞ্চি-ডালপালায় গুলঞ্চের লতায় যে ঘন জঙ্গলের সৃষ্টি করেছে, বাঁশের কচি পাতার ফাঁক দিয়ে শতছিদ্র সবুজ আলো মৃতের মতো চোখ উল্টে পড়ে আছে আর হঠাৎ হঠাৎ আচমকা জঙ্গলের ভ্যাপসা গুমোট গন্ধে বাতাস ফেনিয়ে ওঠে, তখন আলোর টুকরোগুলো কেঁচোর মতো মোচড় দিয়ে উঠলে তাদের পেটের ভেতর নাড়িভুঁড়ি হাতড়িয়ে মরে, ফলে একটা আঠালো রস তাদের গলা ও জিহ্বার নিচে নোনতা হয়ে উঠলে ওরা দ্রুত পেটের মধ্যে তা চালান করে দেয় এবং তখন একটা ভয় ও কৌতূহলের মিশ্রক্রিয়া রেটিনা বাহিত হয়ে রক্তনালিতে প্রবাহিত হলে তারা বাঁশবনের নিচে হাঁটাপথের শূন্যতা অনুভব করতে পারে, কিন্তু তাদের হাতে, একজনের, অন্যদের হাত শূন্য, মরা কাঠটি ঝুলতেই থাকে, যে কাঠটির একপ্রান্তে কালো একটি রবারের পাতলা পাত, যেটা সাপের মতো একটু একটু মাথা দোলায়, যদিও সেটা একটা রবারের চ্যাপ্টা অংশই, তবু ওদের একজনের কাছে অন্তত সেটাকে সাপের মতো মনে হতে পারে- মনে হওয়াটা স্বাভাবিক, কেননা ওটার নড়ে ওঠার মধ্যে, যদিও তা বাতাসে অথবা যার হাতে ছিল তার শরীরের কাঁপনে হতে পারে, তবু সেটা যেন ওঁৎ পেতে থাকে এবং তাদের নিজেদেরকে ওই আপাত ভংয়ঙ্কর সরীসৃপটির সাথে তুলনা করতে ভালো লাগে; যদিও ওই একজন অন্যদের থেকে দূরবর্তী, অথবা প্রত্যেকে ওই ঘটনা ও পরিস্থিতি বিযুক্ত, কিন্তু পাতা ভাঙার মতো ক্ষীণ অথচ বিলম্বিত শব্দটি শুনে বালকেরা সচেতন হয়ে ওঠে, কারণ শব্দটি আর শুকনো পাতা ভেঙে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং শব্দটি যেন দূর থেকে ভেসে আসে, আবার মনে হয় দূরে নয়, খুব কাছেই; কিংবা উভয় রকমের দূরত্বেই হতে পারে; যদিও দূরত্ব বা পথের ব্যবধানটাই বড়ো নয়- প্রধান হল শব্দধ্বনিটির উৎস এবং ধ্বনি সৃষ্টির অনিবার্য কারণ; কারণ তার ক্রমশ নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া অথবা ক্রমশ তার সুপ্তিমগ্নতা তাদের বিচলিতবোধের কারণ নয়; কারণ একজনের রক্তের মধ্যে আচমকা স্মৃতি ঘুলিয়ে ওঠে এবং সে পাশের জনের হাত ধরতে চেষ্টা করে; তখন সে মনে করতে পারে মৈথুনের অভ্যাসের একদিনে কত দীর্ঘ সময় কষ্ট আর সুখের মধ্যে পাশের জন ছিল, যে অড়হড় ক্ষেতের ঘন পাতার মধ্যে চমকে উঠেছিল একটি ফড়িং চলাচলের শব্দে, সেই সময়ভুক স্মৃতি এখন ওদের সবার রক্তের মধ্যে সঞ্চালিত হয়ে গেল নাকি-এই প্রশ্নভাবনার মধ্যে ওরা একসময় লক্ষ করতে পারে যে কখন ওদের দৃষ্টি, চালতার ঘন পাতা আচ্ছাদিত শাখায় নেই, সরে গেছে বাগানের শেষ প্রান্ত ঘেঁষে কঞ্চির বেড়ার ওপারে, যেখানে ইটের সিঁড়ি নেমে গেছে পায়ে পায়ে জলের তলায়, আর বর্গাকার জলের চারপাশের কাদায় জেগে থাকে মেয়েলি পায়ের ছাপ; হঠাৎ করে, অপ্রয়োজনে মরা কাঠের গুলতিটি হাত বদল হয়, তখন তাদের, বালকগুলোর, মনে পড়ে মক্কামদিনা বা বায়োস্কোপ খেলা দেখানোর সেই লোকটা, যার গালের মাংসগুলো যেন ঝামা ইটের মতো ফুটো ফুটো আর সেই ফুটো জুড়ে রোদ আর ঘাম আর একটা মরামাছির চামড়া ওঠা ভাব, কিন্তু ঠোঁট দুটো দিয়ে অনর্গল ছড়াশব্দ মুখস্থ খলসে মাছের মতো লাফায়, তখনও সেখানে, হাসি, একটু করুণ হয়ে ঝুলতে দেখে তাদের ভালো লাগে এবং তারা তখন মক্কামদিনাবাক্সের গোলাকার ফুটোয় মুখচোখ গলিয়ে ভেতরের ছবিগুলোর কাতরানি দেখে আর লোকটার হাতের বাদ্যযন্ত্রের গুঞ্জন তাদের কেমন একটু দিশেহারা করে তোলে, অবশ্য লোকটার পেট থেকে নির্গত শব্দ বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনিপুঞ্জ আর ভেতরের নিশ্চল ছবিগুলোর নাচ- কোনটা তাদের দিশেহারা করে তা যেমন নির্ণীত হয় না, তেমনি লোকটার চেহারা ফাটা বুদবুদের মতো কেন তাও থেকে যায় অনির্ণীত, কারণ এই নয় যে, তারা কখনো জানতে চায়নি; কারণ, লোকটা কেবল গগনজোড়া হাসি বিস্তৃত করে রহস্য সৃষ্টি করে, কিংবা যা বলতে চায় তা আর বলা হয়ে ওঠে না; বলা হয়ে ওঠে না এই কারণে যে, ওরা তখন পাখি প্রসঙ্গে শুনতে চায়, পাখি বিষয়ক কোনো সৌন্দর্যধ্বনিশব্দ নেই কেন- যদিও এই জিজ্ঞাসা-বিষয়ক কোনো মীমাংসায় উপনীত হওয়ার পূর্বেই ঘুড়ি ওড়াবার ঋতুর আগমন ঘটেছে কিনা, এই তথ্য আবিষ্কারে তারা মনোযোগী হয়ে ওঠে; তখনই তারা দৃষ্টির বর্গক্ষেত্রে যে লোকটির উপস্থিতি টের পায়, সেই লোকটি সম্পর্কে ওদের কৌতূহল রয়েছে, ফলে ওদের মনোযোগ ঘুড়ি ওড়াবার ঋতুতথ্য আবিষ্কার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, কিন্তু ওরা তা নিয়ে বিচলিত বোধ করে না; বরং মানুষটি সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠে; সদ্য জেল ফেরত মানুষটির কয়েক বছর পূর্বের ঘটনা ওরা কেউ বিস্মৃত হয় না যদিও; কীভাবে এবং কেন তার যুবতী স্ত্রী গলায় শাড়ি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে তা আজও রহস্যময়; প্রকৃতপক্ষে তা আত্মহত্যা বা খুন এ বিষয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন ও কথার শাখা-প্রশাখা-উপকথা বিস্তৃত হতে হতে একসময় তা আরও প্রলম্বিত হবার মতো থাকে না, তখন সবাই ভুলে যায়; কিন্তু হঠাৎ এবং সংক্ষিপ্ত কাল পরেই লোকটির জেল প্রত্যাবর্তন সকলের ভাবনার স্বাভাবিক গতিকে শ্লথ করে দেয় এবং একথা অনেকের অনেকদিন পর্যন্ত মনে থাকে যে, বউটির বগলের নিচের সাদা চামড়া কেমন লালচে-নীলচে-কালচে রঙের সংমিশ্রণে থকথকে হযে গিযেছিল আর নাভির নিচে যোনি বরাবর মাংস ছিঁড়ে নামছিল রক্তের অবিরল ধারা; যা, একসময়, শুকিয়ে জমাট বেঁধে কাপড়-রক্তমাংস মিলে যেভাবে দলা পাকানো ছিল, মনে হচ্ছিল মৃত সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মেয়েটি মারা গেছে এবং সন্তানের অপূর্ণ ভ্রুণ মেয়েটির পেটের মধ্যে থেকে টেনে আনতে গিয়ে গলে যায়, ফলে সেই পচাগলা ভ্রুণ মেয়েটির যোনি ছিঁড়েফেড়ে নির্গত হয়; আর তার থুতনি মাথা ঝুলে নুয়ে পড়েনি, আবার ঠিক উন্নতও নয়; অথচ দুয়ের মাঝামাঝি ক্লান্ত মুখে একটা চিৎকার ডানা ঝাপটাতে থাকেলেও বোঝা যায় চোখ দুটোতে রয়েছে অসম্ভব নৈর্ব্যক্তিকতা; কান আর নাকের ছিদ্র বেয়ে গড়িয়ে যাওয়া রক্ত বিশুষ্ক হয়ে এলেও সেখানে ক্রমাগত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পিঁপড়ার আগমন ঘটে; চেপে বসা ঠোঁটের ভেতর থেকে জিহ্বা টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে আসবার চেষ্টায় প্রতিপক্ষ যখন ব্যর্থ এবং তখন গালের কোণ সামান্য ফেড়ে গেলে তারা পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণে অগ্রসর হয়; অবশ্য মেয়েটির মৃত্যু বিষয়ক যে সমস্ত কথা লোকমুখে অনেকদূর পাড়ায় পাড়ায় প্রচারিত হয়ে যায়, সেই গল্পগুলো তখন অন্তঃপুরে মেয়েদের মনে বিস্ময়ের উদ্রেক করে; বয়স্করা ভাবে, কলিকালে কত কিছুই না দেখতে হবে, তারা যে যৌবনকালে স্বামীর পানে চোখ তুলে কোনোদিন কথা বলেনি, সেই কথা ভেবে তাদের বুকের ঝুলে-পড়া স্তন কিছুটা কম্পিত ও স্ফীত হয়; হত্যা না আত্মহত্যা এই রহস্য উন্মোচিত না হলে যারা হত্যা বলে মনে মনে ধারণা করে, তারা আতঙ্কিত হয় এবং যুবতী স্ত্রীর প্রতি করুণায় তাদের কণ্ঠ ক্ষীণ ঝাপসা হয়ে আসে; আর কেউ আত্মহত্যা মনে করে কিনা তা অনেকের কাছে পরিসংখ্যানের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়; যুবতী এবং অপেক্ষাকৃত কম বয়স্করা এই মৃত্যুকাণ্ড সম্পর্কে যে মনোভাব পোষণ এবং গোপন মন্তব্যে ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে ওঠে তা এরকম- প্রথম ঋতুস্রাবের আতঙ্ক ভয় উত্তেজনা আর রক্তময় পায়জামা দলা বেঁধে চৌকির নিচে চালান করে দেওয়ার স্মৃতি; এবং অন্য একজনের তলপেট ব্যথা করে উঠলে সে আঁচলের আড়ালে যোনির নিচে হাত দিয়ে বসে পড়ে, সাথে সাথে বিকট শব্দে সে বমি করতে থাকে এবং তার বমিক্রিয়া পেটের ভেতর থেকে নাড়িভুঁড়ি চিপেচিপে যেন রক্তপুঁজ উঠে আসতে চায়, তার অনুগামিনীরা ভয়ে আঁৎকে ওঠে, হয়ত তারা ভয় পায় এ কারণে যে, মেয়েটি গর্ভবতী; তখন তারা উঠোনের কোণে একটি কাপড়ের তৈরি পুতুল পড়ে থাকতে দেখে; একটি মেয়ে তখন শাড়ির ভাঁজ ও আঁচল পরিপাটিতে মনোযোগী হয়ে পড়ে এবং সে কেমন বিবর্ণ হয়ে যায়, সে দেখতে পায় তার শাড়ির নকশাকাটা নীর অংশগুলো থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, প্রতিটি নকশা যেন পরিণত হয়েছে এক একটি রক্তবিন্দুতে, সমস্ত শাড়িটা পচা ইঁদুরের মতো গলে গলে পড়তে শুরু করলে টকটকে লাল সেই বিন্দুগুলো ক্রমশ বড়ো হতে হতে রক্তময় মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়; যেন কচি নরম একপাল মরগি কেউ থেঁতলে দিয়েছে; আর সেই থেঁতলানো মাংসস্তূপ থেকে রক্তস্রোত উথলে উঠলে সে ভয় পায়, তখন তার মুখচোখভ্রুকপাল আর দুই কান বরাবর দাঁত মাংস জংপড়া স্ক্রুপের মতো শক্ত হয়ে যায়; মেয়েটির ভয় তাদের পায়ের গোড়ালিতে সঞ্চালিত হলে অনুগামিনীরা সেখানে দাঁড়াবার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তখন তারা পুকুরের চাতালে এসে দাঁড়াবার অনুপ্রেরণা পায়; যদিও সামান্য বিলম্বের মধ্যে, তারপর তারা এই মফস্বলে পানের জর্দাশিল্পের উন্নয়নের বিষয়ে মনোনিবেশ করে, তখন জর্দার ঘ্রাণ তাদের নাকে ক্রমশ গাঢ় হয়ে উঠলে একসময় তা অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে, তারপর তারা পুকুরের চাতালে এসে দাঁড়ায়, কিন্তু জর্দাশিল্পের প্রসঙ্গ বিস্মৃত হয় না; যুবতী স্ত্রীর ছাদে ভ্রমণের কথা মনে পড়লে তারা স্মরণ করতে পারে যে, যুবতী স্ত্রী ছাদে ভ্রমণ করত, সন্ধ্যাবেলায়, হয়ত বা তখন অন্ধকার হতে শুরু করেছে, লম্বা চুল এলো করে সে বসত, কার্ণিশে, চুলগুলো দুলতো ফণাধরা সাপের মতো; হয়ত সুতা ছেঁড়া ঘুড়ি লম্বা পাটকাঠির মাথায় শিকার করে, আবার কখনো তার হয়ত মনে হয়ে থাকবে ডুমুর বাঁশ কাঁঠালের বন পেরিয়ে ওপারের মাঠে যে বালকগুলো প্রতিদিন খেলে, ওদের মাঝে সুতাকাটা ঘুড়িটা নিয়ে হাজির হতে, অথবা কাটা ঘুড়ি নিয়ে চিলেকোঠা ঘরে তাৎক্ষণিকভাবে পালিয়ে গেলেও বালকদের একজনকে চুপি চুপি ঘুড়িটা দিয়ে দেওয়ার অভ্যাসের কথা যখন বালকেদের দল জানতে পারে, তখন তারা সবাই দূরে লুকিয়ে থাকে এবং একজন ঘুড়ি আনবার জন্য অগ্রসর হলে যুবতী স্ত্রী তাদের কৌশল বুঝতে পারে, ফলে সে ভেতরে ভেতরে পুলকিত হয়, অথবা তার পুলকিত হবার কারণটা অন্যখানে প্রোথিত হতে পারে; হতে পারে নিমের পাতা ঘষে ঘষে ছিটকে পড়া তেতো রোদের ভেতর ছাইগাদায় তাদের ফেলে দেওয়া মাছের কানকো ফুলকো চিবোয় যে বিড়ালটা, হঠাৎ কাপড়সেদ্ধ বা বুনো আমড়া আর খলসে মাছের টক রান্নার আয়োজন ফেলে বিড়ালটাকে বুকে নিতে ইচ্ছে করে এবং একদিন বাসি উঠোন আধখানা ফেলে রেখে আচমকা মনে পড়ে রাজহাঁসের ঘরের মুখের কাঠটা সরিয়ে দেওয়া হয়নি, হয়ত তখন রাজহাঁসের ঘরের ছায়ায় বিড়ালটা উবু হয়ে বসেছিল, যুবতী স্ত্রী বিড়ালের নরম দুধের সরের মতো গা নিজের বুকে চেপে ধরলে শাশুড়ির বকুনি শুনতে পায়, তখন হয়ত রাজহাঁসের ঘরের মুখের কাঠটি সরাতে সে ভুলে যায়, পুনরায় সে ফিরে আসে বাসি উঠোনে, কিন্তু তখন আবার হয়ত তাকে সিদ্ধকাপড়ের ঝুড়ি নিয়ে যেতে হয় পুকুরে; সিঁড়ির ওপর উঠেই সে দেখতে পায় একদল বয়স্ক মেয়েলোক ভেজা কাপড় বদলাচ্ছে, আর কাপড় বদলানোর সময় তারা তাদের ঘর, স্বামী নিয়ে কথা বলছে; তাদের স্তন শুকনো পটলের মতো ভাঁজ হয়ে ঝুলতে থাকে; তারা হয়ত বলে তাদের মায়ের মুখে শোনা মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের গল্পকাহিনি, যে বছর সাবানের দাম বেড়ে গেল; তাদের স্বামীরা তাই নিয়ে কাপড় কাচা বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত নেয়; আর একজনের মাথায় উকুন সারাবার জন্য পাটের বিষ চুলে দিয়ে রাখলে ঘামের সাথে সেই বিষ ঘুমঘোরে মুখে প্রবেশ করলে নোনতা লেগেছিল; সেই যে পেটে তাদের বিষের বেদনা শুরু হল, এখনও সেই বেদনাটা শুরু হলে নাড়ি চিপে পাঁজরের কাঠিতে যেন করাত চালায় ঘ্যাচ ঘ্যাচ করে; আর অন্য একজনের তখন স্মরণে আসে, স্বামীর হাতটা বুকের উপর থেকে সরিয়ে নিলে একটা দাড়াস কি খরিস সাপ তার বুকের উপর দিয়ে হেঁটে যায়, তখন ঘুমের মধ্যেও রক্ত তার পানি হয়ে গিয়েছিল; যুবতী স্ত্রী এসব শুনতে শুনতে নেমে যায়, অথবা সে কিছুই যেন শুনতে পায়নি এবং যখন সে পানিতে ডোবা সিঁড়িতে পা রাখে তখন সে দেখতে পায় দুজন বালক গামছায় ছেঁকে মাছ ধরছে, তাদের সবুজ গামছায় একটা রূপালি চাঁদা মরিয়া হয়ে লাফায়, কিন্তু মাছটা কিছুতেই গামছার ফাঁদের বাইরে আসতে পারে না, হয়ত কোনোদিন পারবেও না; তবু যুবতী স্ত্রী ঝুড়ির কাপড়গুলো দুহাতে ক্রমসংকৃচিত করে আছাড় মারতে থাকে সিঁড়ির মেঝেতে, আর কাপড় থেকে ধূসর পানসে সোডার গোলা পানিতে মিশতে থাকে; তখন শুকনো পাতা ভাঙার শব্দে সামনে তাকালে সে দেখতে পায়, তার প্রিয় বালকেরা বাঁশ আর চালতা বনে গুলতি হাতে একটা ঘুঘুপাখির পিছনে ছুটছে, আর ঘুঘুপাখিটির সবুজ চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে ব্যাকুলতা; পাতার আড়ালে আড়ালে সে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে যেন ভুলে গেছে আতঙ্কে, যুবতী স্ত্রী ডাকে- মায়াপাখি!… জলপাখি!…হৃদয়পাখি!…স্মৃতিপাখি!…মেঘপাখি!… কিন্তু তার ডাক কিছুতেই পুকুরের জলের ইথার ভেঙে ওপারের বনে পৌঁছায় না; তখন তার হঠাৎ কান্না পায়, তখনযুবতী স্ত্রী এক আঁজলা পানি মুখচোখে ছিটোয়; অথবা পুকুরের একগলা পানিতে ডুব দেয়, পা দাপিয়ে সাঁতার কাটে, আর ছিটকে পড়া পানি পতনের ধ্বনিশব্দে যুবতী স্ত্রীর স্মৃতি আন্দোলিত হয় এবং স্মৃতিতরঙ্গে তখন ক্রমাগত একতারার তারে আঙুলের ক্রমসঞ্চালনে সুর সৃষ্টির আনন্দে আর কান্নার সম্মিলিত সুরের ক্রমপরম্পরা হুমড়ি খেয়ে পড়লে তার স্মরণে আসে বাপের বাড়ির, নিশিনাথতলার, ভিখারিটিকে; মেটে বৈঠকখানায় বিছানো খেজুর পাতার পাটিতে বসে সে জিরিয়ে নিত আর সবদিনই গান শোনাত; যদিও সবদিন তারা তাকে ভিক্ষা দিত না, তবু সে গান শোনাত; হাসন রাজার, হয়ত বা হাসন রাজার নয়, অন্য কারো, হয়ত লালন ফকিরের, কিংবা কার গান তা সে সবসময় না বুঝলেও হঠাৎ একদিন শুকনো লাউখোলের পেটের ভেতর সেঁদিয়ে থাকা তারের পরিচিত শব্দে যুবতী স্ত্রী জর্দাশিল্পের কাজ ফেলে ছুটে আসে জানালায়, সেই সুরপরম্পরা তার অনুভূতির জালতন্তুতে স্পর্শ করে যায়- ছুঁয়ে যায়- ইঁদারার অতল গভীর গহন জলের মধ্য থেকে ভোমরা এসে লুটিয়ে পড়ে প্রজাপতির মতো; সেই সুরস্ফুরণ হামাগুড়ি দিয়ে ঝরে পড়ে দলছুট বুনোমেঘের মতো; অথবা আপন অস্তিত্বের ভেতর শান্ত অথচ চঞ্চল, দ্রুত অথচ মন্থর শীতল আবার উষ্ণ একপ্রস্থ জল মাছের আন্দোলনে চূর্ণ হয়ে পড়ার অনুভূতি, যা তাকে ব্যক্তিগত অস্তিত্বের নিমজ্জন থেকে মুহূর্তে আরো নিমজ্জিত করে স্মৃতিলোকে, কিন্তু পরিপার্শ্ব সচেতনতায় সংবেদনে সে চঞ্চল হয়ে পড়ে, জানালা ছেড়ে সে নেমে আসে সদর দরজায়; আচমকা জর্দাশিল্পে নিয়োজিত সবাই এবং যুবতী স্ত্রীর শাশুড়ি বিস্মিত হয়, ভিখারির বুড়ো হাত যুবতী স্ত্রীর মাথায় চুলে চোখে বাষ্পের তরঙ্গ সৃষ্টি করলে তারা উভয়েই কথা বলতে পারে না, যখন কথা বলে তখন তারা জানতে পারে কতদিন তাদের দেখা হয়নি, নিশিনাথতলার মন্দিরের ইট খুলে পড়েছে, পাশের বেল গাছটা ঝড়ে উপড়ে গিয়েছে, আমতলার নিচে এখন কেউ নাকি এক্কাদোক্কা খেলে না, তাহলে খড়ের পুকুরের জল জংলায় ভরে গেল! নিশি… নিশিনা… নিশিনাথ… নিশিনাথতলা! যুবতী স্ত্রী তোমার নিশিনাথতলা, কোনো একক স্মৃতি নয়; বিশেষ মানুষ নয়; আলাদা বাড়ি নয়; ভিন্ন কোনো মেঘখণ্ড নয়; প্রতিদিনের দুপুর নয়; ধুলো ওড়া পৃথক পথ নয়, অথচ সব মিলিয়ে তোমার নিশিনাথতলা, তোমার ফেলে আসা প্রত্যহ, তোমার অনেক দিনের না দেখা- হয়তো না দেখতে না দেখতে ভিখারির গালের হাতের চামড়া আরও ঝুলে পড়েছে, ঠোঁট আড়াল করে রাখা গোঁফ আর লম্বা লম্বা দাড়িগুলো একটু জট পাকিয়ে উঠেছে, যেন একটু হাড্ডিসারও হয়ে উঠেছে, পিঠ যেন একটু বেশি ঝুঁকে পড়েছে, দেখে মনে হতে পারে দাড়ির জট অথবা গলার বিচিত্র যে কাঠের, পাথরের, কঞ্চির মালা শুয়ে আছে, তাদের ভারে বুড়ো একটু কুঁজো; অথবা আনন্দবাষ্প যুবতী স্ত্রীকে বেশিক্ষণ সুখী করতে পারে না; সুখী করতে পারে না এই কারণে যে, তামাক পাতার জ্বলা গন্ধ আর অভিযোগে সে বিব্রত হয়; তখন সে একটা মেয়ে শঙ্খচূড়া সাপ পুরোনো দেয়ালের ফাঁকে প্রবেশ করতে দেখে, কিন্তু সে চিৎকার বা কোনোরকম শব্দ করতে ভুলে যায়, অথবা নির্লিপ্ত থাকতেই সে পছন্দ করে, অথবা ক্ষণিক আনন্দের এই সুখটুকুকে সে সকল উত্তেজনা উদ্বেগ আর তিরস্কার থেকে আড়াল করে একান্ত গোপনে লালন করতে তার ভালো লাগতে পারে; ভালো লাগতে পারে, যেমন একদিন বিকেলে, রোদ্দুর মিশে গেছে ছায়ায়, দৃষ্টি তার কোনো নির্দিষ্ট দৃশ্যে স্থিত না হয়ে পৌঁছে যায়, গাছের ঘন সবুজ আলো পুকুরের জলের তলায় বাঁশ আর গুলঞ্চ লতার সাপ আকাশে হালকা মেঘমণ্ডলের বিস্তার- সবকিছুর ভেতর দিয়ে যুবতী স্ত্রীর মুগ্ধ চোখ গেঁথে যায়, অনেক দূরে, আর সে অনুভব করতে পারে তার পেটের স্ফীত হবার গতি; তখন তার অনুভব বিস্তৃত হয় স্পন্দনহীন ঘনায়মান সন্ধ্যায়; আর ভয় এবং পূর্ণতা, নির্বিকার নৈর্ব্যক্তিকতা, বিভ্রম আর ক্লান্তি আর ভাবলেশহীন নিষ্ক্রিয়তায় সে ক্রমসংকুচিত হয়ে ওঠে, অথবা স্নায়ুউত্তেজনাহীন সে নিষ্পলক শুয়ে থাকে অসংখ্য আলোকিত কবরে, আর তার স্থির চোখের পাণ্ডুর আলোয় নেমে আসে প্রগাঢ় তন্দ্রার শাড়ি; কিন্তু তা যেন তন্দ্রা নয়, বরং সামনের সমস্ত আন্দোলিত সবুজ জলের শান্ত কাঁপন বিলীন হয়ে পড়ে, আচমকা তখন বৃষ্টি নেমে এলে তার উঠতে ইচ্ছে করে না, ফলে তার নীল শাড়ি ব্যাকুল হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে, আর তখন তার জলচূর্নের মতো গুঁড়ো হয়ে পড়তে ইচ্ছে করে, তখন তার বুকের ভেতর রক্তগুলো একটু কাঁপে হয়তো; আর হয়তো, সম্ভবত, তার বায়োস্কোপওয়ালার কথা স্মরণে পড়লে সে মনে করতে পারে, ভেতরের ছবিগুলো নিশ্চল, বৃষ্টি তখন ঘন ও ঝাপসা হয়ে আসলে যুবতী স্ত্রীর শাশুড়ি জর্দাশিল্পের উন্নয়নের পরিকল্পনা ফেলে ছাদে উঠে আসে, এবং চিলেকোঠা ঘরে জর্দা কারখানার কর্মচারী, যুবক, বয়স তিরিশ হবে হয়ত, তাকে যুবতী স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে, শাশুড়ির মনে হয় কর্মচারী যুবকের মুখ যেন কোনো বিষাক্ত পতঙ্গে পরিণত হয়েছে, আর ঐ পতঙ্গ ডানা ঝাপটায় ক্রমাগত অস্থিরতায়; পতঙ্গের লম্বাটে মুখে নাকের বড় ফুটোর সাথে লেপ্টে থাকা চোখ দুটো অন্ধকারে তপ্ত লোহার মতো জ্বলে, আর সেই চোখের মাংস ফেটে লাল টকটকে আগুন জ্বলন্ত মোমের মতো গলে গলে পড়তে থাকে যুবতী স্ত্রীর উপর, শাশুড়ি প্রত্যাবর্তন করে নিঃশব্দে; তখন বৃষ্টিতে ভেজা চুল যুবতী স্ত্রীর গালে তরবারির চিকন ধারের মতো লেপ্টে ওঁৎ পেতে থাকলে তার শীত অনুভব হয়, যা তার মধ্যে নিচে নেমে যাওয়ার প্রেরণা সৃষ্টি করে, নিচে নেমে প্রথমেই তার চোখে পড়ে স্তূপ স্তূপ তামাক পাতা চেপ্টে সংকুচিত হয়ে পড়ে আছে, টুকরো টুকরো করে জর্দা তৈরির কাজে ব্যবহৃত হবে; তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পরিবর্তন তার দৃষ্টি এড়িয়ে গেলেও ভেতরে ভেতরে জর্দাশিল্পের চাহিদা এবং তা থেকে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকলে এই বাড়ির সদস্যরা জীবনের স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলে, বরং চোখ দুটো হিন্দি সিনেমার নায়িকাদের অনুকরণে বাঁকানো আর ঠোঁট ফুলিয়ে যে কথা বলে, যদিও তাতে শব্দের প্রকৃত ভূগোল লুপ্ত হয়, এভাবে পাড়ার সকলের সঙ্গে তারা একটা দেয়াল তুলে দেয়; আর তারা হয়ত যুবতী স্ত্রীর গ্রাম্যতায় তাকে কটাক্ষ করে থাকবে, কারণ সে পাড়ার সমবয়সী মেয়েদের সাথে পুকুরপাড়ে বসে একদিন, তখন হয়ত তাদের শরীর থেকে ঘাম আর ময়লার বাসি গন্ধ পাওয়া যায়; মেয়েরা সেদিন হয়ত জানতে পারে যে, আজ জর্দাশিল্পের কাজ বেলায় বেলায় শেষ হয়েছে, অথবা তারা একটা ভয় আর সংকট নিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে পড়তে চাইলে যুবতী স্থী তাদের হাত ধরে টেনে বসায়, তখন তাদের আঁচলের ছেঁড়া অংশ উন্মোচিত হলে হঠাৎ যুবতী স্ত্রীর মধ্যে স্মৃতির রূপালি জল আছড়ে পড়ে; যে জলবৃত্তে তার মায়ের মুখ শ্যাওলার মতো স্থির ভাসে, কিন্তু তার শ্যাওলা মনে হয় না, মনে হয় জলপদ্ম; ঝম্ঝম্ বৃষ্টির মধ্যে মা যখন কাঁচা কঞ্চি আর সেগুনের মরা ভেজা পাতা চুলোর আগুনে গুঁজে লাল চাল ফুটিয়ে নিত, তখন আগুনের লাল রঙ মা’র মুখে লাগলে মা লালপদ্ম হয়ে উঠত; কোনোদিন হয়তো ধোঁওয়ায় মা’র কাশির ভাবটা বেড়ে গেলে আঘাত পাওয়া কেঁচোর মতো মা’র শরীর শরীরের বাঁকে বাঁকে মোচড় দিয়ে উঠলে মা’র দিকে আর তাকানো যেত না; এ কথা সে ভেবে পায় না, কেন সেদিন সে মা’র কথা মনে করে উথালপাথাল হয়ে উঠেছিল! তারপর আচমকা রাত নেমে আসে আর রাত নেমে আসে এবং অন্ধকারের পরম্পরা অন্ধকারের মধ্যে অন্ধকার হয়ে বিস্তৃত হয়ে পড়লে ভেজা শাড়িতে সে শীত অনুভব করে, তখন তার মধ্যে ভয় সঞ্চারিত হয়; নিস্তব্ধ অন্ধকার; হালকা বৃষ্টি আর বাতাস এবং এ বাড়ির সব মানুষের উপস্থিতি সত্ত্বেও নীরবতা তাকে ভীত করে তোলে; হঠাৎ চমকেও উঠতে হয় তাকে, কারণ বহু ব্যবহৃত দরজা খুলে জর্দাশিল্পের কর্মচারী যখন বেরিয়ে যায়, দরজাটা অহেতুক ক্যাচক্যাচ করে ওঠে, যেন দরজাটা খোলা হয়নি বহুদিন, জংপড়া; চমকে উঠলেও তার মধ্যে কোনা ভাবান্তর লক্ষ করা যায় না, শীত অনুভব করলেও সে নির্লিপ্ত থাকে, বরং তার অস্বস্তিবোধ হয়; অস্বস্তিবোধের কারণ এই চাপচাপ নীরবতা, আর অন্ধকারগুলো যেন সাঁড়াশির মতো তার শরীরে চেপে বসে খুবলে তুলে নেয় খণ্ড খণ্ড মাংস, তারপর রক্তমাংসের স্তূপ যখন উঁচু হয়ে ওঠে তখন একটা ট্রাক অন্ধ ষাঁড়ের মতো ছুটতে ছুটতে এসে মাংসগুলো থেতলে দেয় রাস্তার উপর; আর কঙ্কালের সব সাদা হাড়গুলো লাঠিখেলার সময় যেমন একটি লাঠির উপর অসংখ্যা লাঠি অতর্কিতে নেমে আসে বিদ্যুৎ চমকের মতো, লাঠিগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতে বেজে ওঠে তদ্রুপ বাজনা বাজাতে থাকলে সে পাগলের মতো চার হাতপায়ে হাতড়ে হাতড়ে অহেতুক সুইচগুলো টিপতে থাকে, কিন্তু অন্ধকার কোথাও অপসারিত হয় না, বরং আত্মাহিম করা শব্দে হেসে ওঠে; হাসির শব্দগুলো ক্রমান্বয়ে তার নামে পরিণত হয়, কিন্তু লাশ জেগে ওঠার মতো তীক্ষ্ণ এবং রক্ত জল হবার মতো করে কে তাকে ডাকে? এই তথ্য আবিষ্কার করতে গিয়ে সে এক টুকরো আলো দেকতে পায় কোণার ঘরে; আলোর উষ্ণতায় সে সজীব হয়ে ওঠে; হাতপায়ে যেন একটু দৃঢ়তা খুঁজে পেতে শুরু করে, হয়তো সে নির্লিপ্ত থাকতে চায়নি, কিন্তু জর্দাশিল্পের কর্মচারীর সাথে তার সম্পর্ক বিষয়ক প্রশ্ন শুনে তার মধ্যে ঘৃণার জন্ম নেয়; সে যেন তার সামনে থকথকে পুঁজরক্ত পড়ে থাকতে দেখে, অথবা মৃত পচে গলে যাওয়া বিকলাঙ্গ শুয়োর দেখে হয়তো, তখন আবার সেই একই প্রশ্ন তার স্বামী ও শাশুড়ির মুখ থেকে উচ্চারিত হলে ননদ প্রাত্যহিক তুচ্ছতা বিষয়ে দৃষ্টিপাত করে, তখনও যুবতী স্ত্রী নির্লিপ্ত থাকে; বাইরে বৃষ্টি দ্রুত হতে শুরু করলে ছুটে আসা বাতাসে মোমের শিখাটা কাঁপে একটু, ফলে যুবতী স্ত্রী দেখতে পায়, ঘরের অন্য তিনজনের ছায়া কেমন কুকুরের জিহ্বার মতো ঝুলে পড়ে, আবার হাঠাৎ শামুকের মতো গলা টেনে নেয় খোলশের ভেতর; ছায়া দেখে তার হয়তো হাসতে ইচ্ছা করে থাকবে, অথবা সূক্ষ্ম যে হাসিটা প্রায় অদৃশ্যভাবেই তার ঠোঁটে ক্ষ্মীণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তা হয়তো ছায়া দেখে নয়, অন্য কোনো কারণে হতে পারে, কিন্তু কারণ সে নির্ণয় করতে পারে না; কারণ নির্ণয় করতে না পারলেও হঠাৎ তার হাসিটা থমকে যায়, তার স্বামীর চোখ থেকে ক্রমাগত রাগ অন্ধকারে অন্ধকার হয়ে জ্বলে উঠতে দেখে; ঘরের কোণ থেকে শাবলটা তুলে নেবার সাথে সাথে দমকা বাতাসে মোমের শিখা যখন নিভে যায়, তখন তার স্বামী শাবলটা আচমকা বসিয়ে দেয়; যুবতী স্ত্রী তখন হয়তো হাত উঁচু করে থাকবে; ‘আহ-হ’—এই একটা ধ্বনিচিৎকারের সাথে সাথে মেঝেতে তার পতনের শব্দ পাওয়া যায়, আর তার স্বামীর হাত থেকে শাবলটা ছিটকে পড়ে যুবতী স্ত্রীর পেটের নিচে, যদিও অন্ধকার এই এক মুহূর্তের ইতিকথাকে গোপন রাখতে সাহায্য করে; যুবতী স্ত্রীর দ্বিতীয় চিৎকারটা হয়তো তাদের তিনজনেরই শ্রবণশক্তি লুপ্ত করে দেয়, কেননা তারপর তারা কোনো শব্দ আর শোনেনি, অথবা যুবতী স্ত্রী দ্বিতীয়বারের পর হয়তো আর শব্দই করেনি, কিন্তু যুবতী স্ত্রীর এই দেয়ালভেদী; বৃষ্টিভেদী; বাতাসভেদী; পুকুরের জলভেদী চিৎকারশব্দ পুকুরপাড়ের ওপারে বাঁশ আর চালতাবনে গিয়ে ধাক্কা খায়, তখন বৃষ্টির ধারাপতন অলসভাবে কমে গিয়ে অন্ধকারের মধ্যে কুয়াশাময় সকাল নেমে আসলে বৃষ্টির সঞ্চিত পানি আর কুয়াশা টপটপ করে ঝরে সারাটা বনের চালতা আর ডুমুরের পাতায়; বনে বালকেরা আসে ঘুঘুপাখি শিকারের উদ্দেশে; কবে থেকে তারা ঘুঘুপাখির বাসাটার সন্ধানে ছিল, হঠাৎ করেই তা পেয়ে গেলে ওরা উৎফুল্ল হয়, উল্লাসের আনন্দধ্বনি হুমড়ি খেয়ে পড়ে ওদের চোখেমুখে; ঘুঘুপাখিটার বাসা হয়তো বৃষ্টিতে ভেজা থাকবে; এমনকি ঘুঘুপাখিটাও হয়তো ভিজে ক্লান্ত এবং চলৎশক্তিহীন হয়ে থাকেব; কুয়াশার ভেতর ডুমুরের ডালে ঘুঘুপাখিটাকে দেখা যাচ্ছিল বড়ো দুই পাতার আড়ালে, কেমন নিশ্চুপ; উদাসীন; হয়তো ঘুঘুপাখিটা একটু ঘাড় বাঁকা করে, তখনই বালকেরা গুলতিতে কাচমার্বেল পরিয়ে ছুঁড়ে দেয় তীব্র গতিতে, তখন তারা উল্লসিত হয়ে উঠলে ঘুঘুপাখিটা কোনোপ্রকার ক্রন্দনধ্বনি করেছিল কি না তা কেউ শুনতে পায় না; বরং ঘুঘুপাখিটা মুমূর্ষু রোগীর চোখ ফেরানোর মতো দু’বার ডানা উল্টিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে, হঠাৎ তখন রোদ উঠলে, রোদের ঝলমলে নাচে তারা বুঝতে পারে না সময়ের পারম্পর্য; বালকেরা তখন ঘুঘুপাখিটাকে ঘিরে অর্ধবৃত্ত নির্মাণ করলে, ভাঙা চাকার মতো তারা অগ্রসর হবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে; ফলে তারা তখন ঘুঘুপাখিটাকে পর্যবেক্ষণে মনোনিবেশ করলে দেখতে পায়… ঘুঘুপাখিটার রেশমের মতো মেঘের মতো মায়াবী; কুয়াশার মতো কোমল পালকগুরো জলে ভেজা, আর পেটের নিচের ক্ষীরের মতো নরম মাংসের উপর একটা গর্ত, লাল, আর তার ভেতর দিয়ে কাচমার্বেলটা প্রবেশ করে বুকের মধ্যে ফুসফুসটাকে পাঁজরের সাথে চেপ্টে দিলে ঘুঘুপাখিটার ডুমুরের ডালে বসে থাকবার শক্তি লুপ্ত হয়; লাল গর্ত থেকে, নাড়িভুঁড়ি, একখণ্ড মাংসপিণ্ডের মতো উঁকি দিতে থাকে; আর রক্ত গড়িয়ে জলমাখা পালকে আটকে গেলে চোখের পাতা উল্টানো ঘুঘুপাখিটাকে দেখে তারা ভয় পায়; কিংবা ভয়বোধ তাদের স্নায়ুকোষে তরঙ্গ সৃষ্টি করে অন্য কোনো কারণে, অথবা আদৌ কোনো ভয়বোধ তাদের স্পর্শ করেনি; তাদের উল্লাস থিতিয়ে আসবার পিছনে আছে একটা বিষণ্নতা বা বিষণ্নতা নয়, অভ্যাসবশত উত্তেজনাবিমুখ তারা; বরং তাদের একটু চমকে উঠতে হয়, কারণ বাঁশতলার হাঁটপথের শূন্যতায় হঠাৎ বায়োস্কোপওয়ালার আগমন ঘটে; ফলে বালকেরা একটু যেন অস্বস্তিবোধ করতে থাকে, কারণ বায়োস্কোপওয়ালার ঠোঁটে ঝুলন্ত হাসির এক ফোঁটাও অবশিষ্ট নেই, তার পরিবর্তে দু’ঠোঁটে কিছুটা দুঃখকষ্ট চেপ্টে আছে; আর শুকনো পাতা ঘুড়ো হয়ে যাবার শব্দের সাথে মিশ্রিত হয়ে থাকা অপর শব্দের উৎস সন্ধানে তারা পুকুরের পানে দৃষ্টি ফেরালে তাদের দৃষ্টিপথে অবয়ব পায় নিশিনাথতলা গাঁয়ের গরুর গাড়ি আবাসগৃহ সংলগ্ন দু’কামরা বিশিষ্ট জর্দাশিল্পের কারখানার সাথে দাঁড় করানো, তখন বালকেরা বাযেস্কোপওয়ালাকে তার মক্কামদিনা বাক্সের ভেতর পাখি বিষয়ক কোনো চিত্রকলা বা পুতুলশিল্প আছে কি না- এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে পারে না; বায়োস্কোপওয়ালা কোনো সম্ভাষণ বা উক্তি ছাড়াই চলে যায়, এমনকি লোকটা হয়তো কোনোদিন আর বাঁশবনের এই হাঁটাপথে বায়োস্কোপ নিয়ে আসবে না- এই ভাবনা তাদের মনে উত্থাপিত হয়; এবং তখন হয়তো তারা বিচলিত হয়ে পড়ে…

লেখকের সংক্ষিপ্ত পরিচিতিঃ
আবু হেনা মোস্তফা এনাম

জন্ম ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭২ মেহেরপুর
বাংলা সাহিত্য নিয়ে লেখাপড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

গল্পগ্রন্থঃ
ক্রুশকাঠের খণ্ডচিত্র অথবা অভাবিত শিল্পপ্রণালী, ধারাপাত [২০০৫]
নির্জন প্রতিধ্বনিগণ, সাহিত্য প্রকাশ [২০১০]
উপন্যাসঃ
ক্রনিক আঁধারের দিনগুলো, নান্দনিক [২০১৪]
সম্পাদনাঃ
অগ্রন্থিত গল্প : মাহমুদুল হক, সাহিত্য প্রকাশ [২০১০]
আলোছায়ার যুগলবন্দি, মাহমুদুল হক স্মরণে, সাহিত্য প্রকাশ [২০১০]

মন্তব্য

টি মন্তব্য করা হয়েছে

logo-1

চারবাকগণ: রিসি দলাই, আরণ্যক টিটো, মজিব মহমমদ, নাহিদ আহসান

যোগাযোগ: ০১৫৫২৪১৯৪৪২, ০১৭১৮৭৬০৮৪৮, ০১৭২০৩০১৬৩০

ই-মেইল: charbak.com@gmail.com
ডিজাইন: ক্রিয়েটর