পাভেল আল ইমরানের ‘লিলিয়ান এবং মৃত কবির আত্মা’ থেকে কবিতা

0

বই সম্পর্কেঃপাভেল আল ইমরানের কবিতার বইয়ের কভার
মূলত প্রেমের কবিতা নিয়েই ‘লিলিয়ান এবং মৃত কবির আত্মা’র আপাদমস্তক। পরাবাস্তববাদীতা, অবচেতনা, মত্ততা,ঘোর আর বেদনার ঝঙ্কার রুধির মত বহমান কবিতাগুলোর রন্ধ্রে। গদ্য ছন্দের পাশাপাশি আধুনিক অতিমুক্তক  অক্ষরবৃত্ত ছন্দ,স্বরবৃত্ত ছন্দ যেমনি ব্যবহৃত হয়েছে- তেমনি উত্তরাধুনিকতা, শব্দের নতুনত্বে মোড়ানো।

লিলিয়ান এবং মৃত কবির আত্মা

আমি মৃত নই, লিলিয়ান!  অদৃশ্য জীবিত আত্মা, দুরে কোথাও খুঁজোনা, তোমার চোখ ভেঙে যাওয়া ডালিমের লাল রঙ্গে খুলে গেলেই সারা কামরায় গোলাপ জল ছিটিয়ে যাবে- দিগন্তে উড়া সব বেসিল লিফে আমার সুবাস।
তোমার ঘরে এলেই আমার আত্মা আতর পাতা ঝরিয়ে অন্যগ্রহে উড়াবে তোমাকে।
সারা শরীরে হাজার চাকু আঘাত করে ঢুকে যাবে আমার নিঃসৃত কস, অস্তিত্বহীন নিশ্বাসে জাহান্নামের আগুনের শক্তিতে পুড়ে আলো গর্জন করবে তোমার মাংশপেশী ।
তোমার ঘরে এলেই আমার আত্মা আতর পাতা ঝরিয়ে অন্যগ্রহে উড়াবে তোমাকে।
জিকিরের আবেগ আর বিশুদ্ধতম ভক্তিগীতি নাচিয়ে তুলবে প্রতিটি রগ আর রক্ত কনা । আমার শরীর গুড়ো গুড়ো হয়ে মিশে যাবে আকাশে মাটিতে আর গাছে, আঙ্গুলের প্রতিটি স্পর্শে পবিত্র চুমুগুলো বুক আর হৃদপিণ্ডের অনুতে গেঁথে রবে, তখনি দাউদাউ করে জ্বলবে জান্নাতি ঠোঁট ।
হায় লিলিয়ান ! আমি মৃতের মিছিলে দুরন্ত লাশ ।আবেগ আর আগুন চোখে নিয়ে ভালোবাসা নামিয়েছি । বৃষ্টি বিদীর্ণ করে আকাশ চূরমার করে ইউসুফের পায়ে গেঁথেছি ভালবাসার শ্লোগান, নক্ষত্রের থুতনি নড়ছে ক্রমাগত আমার সুফিয়ান ঘোড়াগুলির আর্তনাদে ।
হায় আমার  লিলিয়ান! আমি মৃত নই;  অদৃশ্য জীবিত আত্মা, আতরের গন্ধযুক্ত জাহাজ নিয়ে নামি তোমার দাম্পত্য ঘরে।

লিরিক্যালঃ ভাব তর্জমা ২

শিসে মে শিসে তাসবির জলে ভাসে পাতা মুখ
কলব তলে দারুচিনিতৈল উছলে উদোম হাটে

জ্যোতির মাঠে নাঙা মেষের পাল ঘাসি উড়ায় ঘোরে
ডানার আওয়াজ বেড়িয়ে নাচে হায় নৈশ দুয়ার খুলে।
ফাঁস হয়ে যায় চিন্তা তরজমা
তোমার চিন্তা তরজমা- যেসব ঢাকছিলে আলয়ানে
সবুজ খোদাই নকশিআলোর দড়ি বেয়ে ঝরে।
হ্রেসাশব্দে ঘ্রাণ বাজে সুর দুলের তালে রাঙা কায়
গোপন বিলাস রাজ বউয়ের ঐঘরে; হৃদছুটে উল্কায়

ইশকে মাতোয়ালি জংশন হুল্লোরে রই  জ্বলে
গলে রুহিতনের দেহ। মেশকাম্বার কার বানী আর গুনে
ছড়ায় স্বর্ণা বকের লোমে,
ওয়াকফের কেশরঞ্জনী ফুলে- গুলতানি গুঞ্জনে।
ভাবের শানাই সিরাত দিছে খুলে সিরাত ঝকঝকিয়ে প্রাণে –
লিলিয়ানের পাপী কথা পার করে জান্নাতে।

গুলযার পাখি
কবি সরদার ফারুক’কে উৎসর্গ করা

আগুন পোহাতে বসো বন্ধু,  মোম হয়ে বসো, মোমের অন্তের গূহায় সুমগ্ন গুজারে কতটা গলেছো অথবা গলোনি আত্মার মজলিসে গুজারেশ করো । কুড়িয়ে তরল মোম গুনে নাও, উড়ে যাক, যেভাবে ভাতের ভাপ মেঘের সারথি হয়, ফিরে আসা কালিটুকু দ্রবিভূত হোক কালের  পাথরে।

আগুন পোহাতে বসো প্রিয়তা, এখানে, এই সুস্থ রঙের শব্দাবলীর তাপে,  শ্বাসযোগ আছে এমন চিত্রকল্পের হৃদয়ের হাড়ে নাও তনযেব তহরীর।
কবিতার শীতকাল বাইরে,প্রচণ্ড । আগুন জ্বালিয়ে বসো এই খুমারির খড়ে, শুষে নাও ধ্যান, উড়ে চলা ধ্বংসাবশেষ বিষাক্ত  ছাই তুলে নিয়ে চামড়ায় ঢলো, দৈব ঈগলের ডানা বেজে উঠবে, মুঠোয় করে নাও ভাসিয়ে বোধের তাজা জখম জ্বলনে।

আগুন জ্বালিয়ে বসো প্রিয়ো, এইখানে, এই মদের সুঘ্রাণে সাজ করা আগুনের আঁচে, মেখে নাও মাংশের প্রতিটি পৃষ্ঠায় ধারালো কয়লার নেশা,চৈত্যন্যের দেয়ালে মত্ততা ঘষে ঘষে হয়ে উঠো উন্মাদাগার তৃলোকে, আর আঙুরলতায় জড়ানো গাছের ডগা নাড়িয়ে উড়িয়ে দাও আশ্চর্যলোমের গুলযার পাখি।

আত্মহত্যা লিপি

অস্তিত্বের বর্ণ নিয়ে জন্মেছে যে ঘাসফুল
বারবার খরগোসের কানের পাতার মতন নড়ে উঠে বিজলীর আলোয়, হঠাৎ।
পাতা আর আকাশ চাষ করে বেঁচে থাকতে চেয়েছিল এক কল্পবিদ
তাকে সবাই বাজারে বিছানায় বড় বড় কবিতা আবৃতির শব্দের বাগানেও দেখেছিলে
এক ফোটা সুচারু কথার কনার জন্য খরচ করেছে কারি কারি সময়ের কয়েন
ঘাঁটে ঘাঁটে নৌকা বিড়িয়ে জেনেছে , নৌকা কখনই যোগ্য ঘাঁটে ভিড়ার শক্তি অর্জন করেনি
কারণ স্রষ্টা ছাড়া আর কেউ জয়ী নয় পৃথিবীর ময়দানে
নৌকা যতবার মাছেদের নিশ্বাস গুনেছে , জেনেছে নিশ্বাস ফেলার বিপক্ষে কত কষ্ট যে ভোগ করতে হয় কল্পবিদের , স্বাদহীন নিশ্বাস।
কাগজের ঠোঙ্গায় পেঁচিয়ে পড়ে থাকে যদি একজীবনের সমস্ত ইচ্ছেরা
ইচ্ছেরা তো বড় বড় ডাইনোসরের মত , পিপড়ার মত কিংবা প্রজাপতির খোলস গায়ে
কত লাফিয়েছিল শুন্য উঠোনে,শুন্য বলেই অতোটা পেরেছে নিজের আকৃতি পাল্টাতে নিজের খেয়ালে
কল্পবিদের অস্তিত্ব ভালো জাতের জলরং ছিল ,অস্তিত্ব রঙা ঘাসফুল
হঠাৎ আলোয় নড়ে উঠে খরগোসের কানে : ঘাসফুল সবসময়ই জ্বলতেই থাকে।

কালো রাজহাস

উঠোনের কালো রাজহাসগুলো, বিকারগ্রস্থ-বিজাত
যদি ঘূর্ণিবায়ুর মিছিলে ডুবিয়ে নিজেকে
ঈগলের পালকে ভর করে মেঘের ভরণ পোষণের
চিন্তা নেয়ঃ পিতৃহীন ময়ুরের ঘ্যানঘ্যানানি কে নেয় উত্তম মগজে ?
স্বপ্নের রাজহাসের পালকের শিলাবৃষ্টি ধানহীন নারাক্ষেতে
কেউ দেখেনি তাদের গলে যাওয়া দেহের ক্ষত…।

রংহীন-আস্তরহীন ইটের মাংসে ঠাঁসা

অনুভুতির পুকুর বোঝাই শিংমাছ নিরুদ্দেশ হওয়া বাদর ছেলেটি হয়ে মায়ের কলিজার ক্ষতে চাপা কান্নার আঁচল। সারাক্ষণ দিনের আলোর সাথে মিশে তোমার সুরের শরীরে রাজ মিস্ত্রির কাজে এত পটু। ঝুলন্ত হাজার বাবুই বাসায় ঠোঁট জোড়া ঝুলিয়ে রেখে গেছো,ঢাকার বিলবোর্ডে ঘাসের ফুলের পাশে দাঁড় করিয়ে তোমার মুখের খোঁলস।
স্নানে নেমে দেহের অপ্রবিত্র স্পর্শ আমার সরিয়ে হয়ে গেলে রংহীন-আস্তরহীন ইটের মাংসে ঠাঁসা পুরান ঢাকার অট্টালিকা। এখন মৃত্যু তোমার নামেও আইন হলো। অঙ্গে অঙ্গে পাটের আঁশ গেঁথে ঝরঝরে বালির গুণাগুণ পেল অমৃত সৌন্দর্য, কুমড়োর শাখায় ভাঙ্গা পাথরের তেজ পুষে দিয়ে নাকফুলে চিরসংসারের অশান্তি সাইনবোর্ড। গভীর সমুদ্রতলের চাপ যখন রাত ফজরে গড়ানো তোমার ঘুমের মগজে, স্ক্রিপ্ট অজ্ঞাত অভিনেতার মত ঢাকার রাস্তার নিয়মিত বিরক্তিকর অভ্যাস তোমার সারা দিনের দেহে …
তুমি এখন সামনে দাঁড়ানো নিজের নিশ্বাস নয় , ফার্মগেটের ওভার ব্রিজে উঠা মানুষের ভিড়।

মাটিতে নক্ষত্র

গাছটা অনেক নিচে নেমে গেছে তবু লিচুগুলো উড়ছে বেজায়
মাটির শরীরে কত পিঁপড়েরা পাহারা বিমুগ্ধ
হলদে-সবুজেপাতা নিশ্চিন্তে এলিয়ে পড়ে নারীর নরম গালের তিলের ঘাসে
কতগুলো পাখি নির্বোধ জনগনের মত পালকে ঢুকিয়ে চঞ্চু ঘুমুচ্ছে মায়ের কোলে
যে-ই যায় ওখানে মুখের ঘাম মুছে গামছায় শ্বাস ছাড়ে
আইসক্রিম’য়ালার কাঁসর বাজানি বাদাম’য়ালার রই ধ্বনি
উত্তর বাড়ির বাচ্চাদের ফুটবলটাও আঁচল খুঁজে শিকড়ে
কতদিন পর বৃষ্টির আতিথেয়তা রাখালের কড়াই পিঠের ভাঁজে
আর লিচু গাছে খেজুরের কস
গাছটি অনেক নিচে নেমে গেছে যদিও , লিচুগুলো উড়ছে বেজায় …।

নগ্নাকীর্তনিয়া

নগ্নার ফ্রকে বৃষ্টির দাগ লেগে আছে
বিন্দু বিন্দু ইচ্ছের ফোটা টলমল করে আঁচলের মাঠে
গ্রীবাদেশে ঝরনার মতো ঘোড়ার খুরের আওয়াজ
কিছুতেই ধুয়ে ফেলতে পারছেনা এ বিদঘুটে ছায়া
নগ্নার চুমুর গায়ে বৃষ্টির দাগ লেপে যাচ্ছে
চাদরের মত পেখম ঘুটিয়ে নিচ্ছে নিশ্বাসেরা
সে নিজেই বৃষ্টির দাগ , ফ্রকে নগ্না লেগে আছে।

নগ্না, তোমার গোছলের জল
বরফযুগ হয়ে জমে আছে বুকে
নগ্না, তোমার চুলের বাতাস
ত্রাস ছড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে চোখের সিড়িতে

নগ্না, হরতাল আমি বুঝিনা
কিংবা আইনের শ্যাওলা
নগ্না, বুকের রাজপথ ধরে শুধু
ধোঁয়ার মিছিল নামিয়ে কুয়াশা হই

ঘর থেকে বেরিয়ে দেখো নগ্না , টাইটানিক তোমার পুকুর ঘাটে বাঁধা আছে এখনো।
সমুদ্র ভ্রমণের কথা সে বিলকুল ভুলে গেছে।

অমন কম্পন আর আমি কারো শরীরে শুনিনি, নগ্না
কি ভয়ঙ্কর শুষ্কতা ভরাট বালিগুলো উড়িয়ে দিতে মরুর মত
এত রস আর কাউকে উড়াতে দেখিনি, নগ্না

নগ্নার গর্জে উঠা  পাতলা কোমর
ফেরাতে পারিনি নক্ষত্রের মত ঠোঁটের জ্বলন
তুমি দোজগেই সূর্য পেতে বসবে নগ্না
আমি আগুনের বাজনা ছেড়ে কোনো বেহেস্তেই পা বাড়াতে পারি না
কত জাহাজ ভর্তি স্তনের বাতাস উড়িয়ে ভেংচি কাটে জান্নাতি নারীর দারু
নেশার চামড়া উপরে ফেলে ভাসতে পারিনি আরো সহস্র নেশায়
আমি দোজগ ছেড়ে কোত্থাও যাব না নগ্না
তোমায় ছেড়ে কোত্থাও যাব না জাহান্নামিনী।

লিলিয়ান এবং মৃত কবির আত্মা । পাভেল আল ইমরান । প্রচ্ছদ শিল্পীঃ আইয়ুব আল আমিন । প্রথম প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ । প্রকাশনীঃ ঘাসফুল । বইমেলায় প্রাপ্তিস্থান – ঘাসফুল বুকস্টল নং ১৩৭ । সোহরাওয়ার্দী প্রাঙ্গণ এবং লিটলম্যাগ চত্বর ২৩ নং এ ।

মন্তব্য

টি মন্তব্য করা হয়েছে

logo-1

চারবাকগণ: রিসি দলাই, আরণ্যক টিটো, মজিব মহমমদ, নাহিদ আহসান

যোগাযোগ: ০১৫৫২৪১৯৪৪২, ০১৭১৮৭৬০৮৪৮, ০১৭২০৩০১৬৩০

ই-মেইল: charbak.com@gmail.com
ডিজাইন: ক্রিয়েটর