ফারহান ইশরাকের ‘বীজপত্রে একান্ত গণিত’ থেকে কয়েকটি কবিতা

0

জামাজুতাফারহান ইশরাকের 'বীজপত্রে একান্ত গণিত'

দশ মাসের ভ্রুণ ফেরেশতারে ডেকে বলল: জুতা কিনে দাও
ভূমিষ্ট হব। পৃথিবীর জলকাদায় খালি পায়ে হাঁটব কী
করে! শুনেছি সেখানে মানুষ এত বেশি কান্নাকাটি
করে, চোখের পানিতে পা-রাখার জায়গা পাওয়া ভার!
মাবুদরে বল জীবের দুঃখ কমিয়ে দিতে, না হলে যাব না!

ফেরেশতা বলেন: দুনিয়া পবিত্রস্থান, জুতা পরে কী করে প্রবেশ
করবে? ভ্রুণের অনুযোগ, লজ্জা করছে পিরহান না পরালে
খালি গায়ে যেতেই পারব না!
ফেরেশতার মেঘভেজা ডানা ভ্রুণের আবদারে মুহূর্তে শুকাতে
চায়! বলেন তিনি: তোমার দেহপুঞ্জ আবৃত নরোম চামড়ায়
শরমের কিছু তো দেখছি না! পিতৃস্নেহ তোমারে ঢেকে রাখবে
মায়ের কোলের চেয়ে ভালো মখমল প্রভুমঞ্জিলে আছে কিনা জেনে
নিতে হবে। যতই জামা পরা হোক, মানুষ তো ন্যাংটাই থেকে
যায়!
ভ্রুণের মুখে নানা অজুহাত গুঞ্জরিত হতেই থাকলো। প্রসবের
লগন এসে যায়। চাহিদাক্ষুব্ধ শিশু প্রকট চিৎকারে ক্ষোভের
কথা জানিয়ে দিতে থাকে। সেই থেকে দুনিয়াও কেঁপে উঠছে
ক্রমবিপ্লবে!

বীজঘুম ভেঙে আয় পাতা

ফুটপাতে একটা গাছ। কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সোজা দাঁড়িয়ে
বসার অনুমতি নাই। নিজের পায়ের দোষে হাঁটতে পারে না
এক পাশে চেয়ার স্টোর অন্য দিকে বালিশ বিপণী
গাছের সখ একরাত তুলার আরামে ঘুমাবে, এক বিকেল
চেয়ারে জিরাবে।
পূর্বপুরুষ কর্তৃপক্ষের চাপে তক্তা হয়েছিল, র্যাঁদার শৃঙ্গারে
এত মসৃণ, সবাই বলল: বসার কুরশিরূপে পূনর্জন্ম হোক!
হাতুড়ি আসল এগিয়ে, তারকাঁটা বাড়াল তার তীক্ষ্মতার
হাত। বাস্তবে রূপ পেল গুঞ্জরিত সেই কল্পনা!
উপরমহল চায় পত্রতালুকা খুলে সে কেবল ছায়া দিয়ে যাক
প্রত্যহ চেয়ার বিকায়, তার আর বসাই হয় না! চড়া দামে
বালিশ কাটছে; তার মাথা বালিশে ঠেকে না!
টাকার হিসেব তার জানা নাই। অংক শেখার দিনগুলো
আগেই বেহাত! ইস্কুলে নাম লেখাতে একটুমোটে স্বপ্ন দেখেছিল
একটাই সান্তনা আছে, উন্নয়নের করাত তারে কাটতে পারে নাই।

পিতৃত্ব

দাঁড়িয়ে থেকে থেকে গাছেদের পায়ে ব্যথা হয়
বোঁটায় ভার একটু কমিয়ে দিলে বাবাগাছ
আরাম পেতে পারে ভেবে একটা ফলও কি
পাকার আগে ঝরে পড়তে রাজি?

বাবা মারা যাবেন বলে হয়ত চাইলেন আঁটি
ফেটে চারাগাছ মাটিতে দাঁড়াক!
ফলে তাই হলো, সবুজ পাতায় গোডাউন বসে
গেল। খাদ্য কারখানা থেকে ডাই-অক্সাইড
চুষে নিয়ে সূর্য উঠল।

বাবার হাতে লক্ষ লক্ষ কাঁচা ফল। যুগ যুগ পায়ের
পাতায় ভর করে আছেন অভাগা। পাঁচ আঙুলে
কত পাখি বাসা বাঁধল! কত গান শাখা ঘুরে
হেড-অফিস মাতিয়ে তুলল! গাছের উদ্দেশে
একটা ফলও বলল না, ঝরে যাচ্ছি, তুমি একটু
আরাম করে নাও, বাবা!

জিয়োমিট্রি

দাগ  কেটে জমি ভাগ করছে জন্মান্ধ সমাজ। অংকবাদীরা
বলছে: এ যে মালিকানার জ্যামিতি, এর তো বিকল্প হয় না।
দলিতরা মনে করে সবাই মিলে কাঁদলেই দলিলচিহ্নিত জমির
আল মুছবে, সমতার পায়ে সালাম ঠুকবে দাম্ভিক মালিকানা।
পানি ও শামুকের জিবে পাথরও ক্ষয়ে যায়; সুতরাং তারা
ভাবে, বৃষ্টিই পারে আল মুছে মালিকানা সুষম করে দিতে।
বীজের ভালভা খুলে পলির উপর অংকুর উঠে আসে। তারা
কি মালিকের নাম জানে যে তার নিজ নামে জমি লিখে নেয়?
তার পরে ভূমিকম্প শুরু। সে তো দাগ মোছার আসল ওস্তাদ!

মহাশূন্যের বাটি ভরা সুরাপানি

মহাশূন্যের বাটি ভরা মদ একা একা কুলাতে পারব না
নাড়িভূঁড়ি যার শুকিয়ে গেছে, রাতের আগেই ছুটে এসো
জোছনায়। চুমুকের টানে ঝড় এসে গেলে মরে যাব-
শরবতে! কাঁদতে কাঁদতে ডুবতেই হবে তলানির শেষ দাগে।
দালানকোঠা টাওয়ার মঞ্জিল তলিয়েছে দেখছ না? ঘরে
যাবে? সে আশায় গুড়ে বালি! গলা উঁচু ক’রে কাতর বৃক্ষরাজি
অক্সাইড পাচ্ছে না। কাচের মটকা গুতা মেরে কর
ছাতু! ওতে পুষবে না, সাত আসমানে একাকার সুরাপানি!
অযথা পোশাক খুলে ফেল আগে, তেজস্ক্রিয়া ফুটিতেছে
রঞ্জকে!
শাস্ত্রকথাও গলে যাবে মদে, চোখের পানিতে পড়ার হরফ
বড়শির মতো ক্যালিগ্রাফি হবে। মদ্যপিপাসু কিছু মাছ ছাড়া
অপাপ জলধি জুড়ে কিছুই থাকবে না। শূন্য সভার বাটি ভরা
মদ, তৃষ্ণার টানে এসো, মদিরামরণ বিনে কী ক’রে বাঁচবে?

সড়ক প্রযুক্তি

পকেট কেটে বেরিয়ে পড়ছে অজস্র রাস্তা। জিজ্ঞেস করো কোথায় যাবে
বলতে পারবে না। কোনোটা অনেক দূরে যায়, বাড়ির ঠিকানা হয়ত
নিজেই জানে না।
ডিমের ভেতর থেকে একটা পথ উড়ে যায় রকমারি প্রশাখার দিকে
খড়কুটো জমিয়ে  কেউ  সেথা এক উষ্ণতার আবাস গড়ে তোলে
একটা হয়ত খেয়াঘাটে বসে ভাবে ফেরি ছাড়া তার কোনো উদ্ধার
মিলবে না।
কতেক সরণি আছে হাওয়ায় ঝোলানো। দোল খেতে খেতে একটা
চোখের
থেকে আরেকটায় লাফিয়ে পৌছায়! জাগরণ ছাড়িয়ে কোনোটা ঘুমের
ভেতর একটু দেবে যায়। স্বপ্ন স্বপ্ন বলে একটা আবার চোখের লালায়
আস্তে গলে যায়।
নিজের গড়া রাস্তায় হেঁটে কারো কারো অহমিকা সীমানা ছাড়ায়
যে রাস্তায় সে রাস্তা খুঁজে পায়, বলতে পারে না তার স্থপতি-সংবাদ।

তিন দাগ সমুদ্রে ভেজানো

জীবনের তিন দাগ সমুদ্রে  ভেজানো, এক ভাগ লবণ ফ্যাক্টরি
পার হয়ে পান্তাভাতে মাথা কুটে মরে। ফেনার তালুকে জিভ
ফণা ধরে আসে সেই পানি।
ট্রে’র খোলে রসগোল্লা রাখার বদলে শব্দ সাজিয়ে রাখছি
রস বলতে হরফের রতি, সলতে ধরে একাকি জ্বলতেছে
কথার কাস্টোমার এসো, চার ফর্মা সেল করে নাস্তা সারা
যাবে।
হৃদয় এমনই কিনা, দেহ থেকে লাফিয়ে নেমে কথা বলতে পারে
অঙ্গবর্তনি  থেকেও বিদ্যুতের চিড়িক ছুটে ফর্সা হয়ে যায়
উইন্ডো খুলছি দূরঅধ্যায় দেখতে পাব  ভেবে, কত  ভোরে
ট্রেন ছেড়েছিল।
যাবোই বা কই? রাস্তা বলতে সাপ, শুয়ে ছিল পছন্দের
মাপে। কে কোথায় পা রাখবে বিরূপতা নাক গলাতে পারে!

ফেরেশতামি

আমার যে মেয়েটার জন্ম হয় নাই সে এখন কোথায় আছে
এ কথা ভাবার সাথে খিলখিল হাসির শব্দে স্বপ্ন ভাঙল।
ডাক্তার বলেছে মনে করো শিশু মাত্রই তোমার সন্তান
বাপের সম্মান যদি না রাখতে পারি সেই ভয়ে ইচ্ছে করে
পুত্র হয়ে থাকি, পিতার বেদনা পিঁপড়াপন্থী মানুষ বোঝে না।

জন্মের আগে ঝাঁক ঝাঁক কচি ফেরেশতা কচুপাতার পানির
মতো টলমল করতে থাকে। মায়ের জরায়ুকে স্টেডিয়াম ভেবে
ডিমের মতো শিশু শয়তানি করে, এটা তার নির্দোষ খেলা।

মা যদি জোরছে ডাক দেয় খাদ্যপুষ্টি অনুষদ উপড়ে দিয়েই
মেয়েটা তো চলে আসতে পারে দ্রুত। প্রসব ছাড়াই সে আসুক
বুকের খঞ্জরে ফুল ফুটে আছে। বাবা বলে উঠুক সে ডেকে
তাহার ফেরেশতামি দেখতে চেয়ে পথ হলো বিশাল রাবার!

টিসুসভ্যতা

খাবার টেবিলে টিসুপেপার নিয়ে তারিফের গুঞ্জন চলল একটানা
জিনিসটা মোছার ফরমাশে এত ভালো, খারাপ কিছু নিন্দুকেরও চোখে
পড়বে না।

একজন বলল: পরের ময়লা গায়ে মেখে পলকে সে নোংরা হয়ে যায়
নিজেকে মোছার কায়দা রপ্ত আছে তার, হলফ করে কে বলতে
পারে? গড়নে এতই নরোম, সামান্য পানির ছিটায় গোশত খসে পড়ে!
বড়োলোকি ভোজসভা, চামড়ার নিষ্ঠুরতায় পা না ঢেকে কেউ কী আর
ভেতরে ঢুকতে পারে? গামছার তবু সখ হলো, রাখালের কোমর জড়িয়ে
শরিক হতে চাইল সে পানচুমুকের সেরা মজলিশে।

দরোজার ফাঁক দিয়ে সবাই দেখল শহরে ঢুকতে গেরামেরও খায়েস
কম না। কেউ ভাবল, একে অন্যের ভেতরে ঢোকাই তো সভ্যতা!
একটা কণ্ঠ বলল, গামছাই তো ভালো। অন্যকে মোছার পরে নদী থেকে
ডুব দিয়ে আসে। তার পরে রোদের চুম্বকে কী সুন্দর বাতাসে চমকায়!
কথার রেশ অন্য দিকে ঘুরিয়ে কে যেন নতুন আভাস তুলল জিভে

সে বলল মানুষ প্রসঙ্গে। মানুষ কেবল নিজের হুজুরি ফলায়। অন্যের গায়েবি
ময়লা সাফ করে খুশিতে আটখানা। নিজেরে ধুইতে গিয়ে তার দশাও
টিসুর মতো রিস্কি হয়ে উঠবে না তো!

প্রথম প্রকাশঃ অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৬ । প্রকাশকঃ কাঁটাচামচ । কপিরাইটঃ কবি । প্রচ্ছদঃ নাজিব তারেক । বর্ণবিন্যাসঃ মাসুদ, খসরু । মুদ্রণঃ প্রিসাইজ প্রিন্টার্স, ৮৫/১ ফকিরাপুল ঢাকা ১০০০ । কাঁটাচামচঃ ৫০ কোমরউদ্দিন লেন, ফকিরাপুল ঢাকা ১০০০ । আইএসবিএন: ৯৭৮-৯৮৪-৩৪–০৩৬৭-৪ । ১৭৫ টাকা ।

মন্তব্য

টি মন্তব্য করা হয়েছে

logo-1

চারবাকগণ: রিসি দলাই, আরণ্যক টিটো, মজিব মহমমদ, নাহিদ আহসান

যোগাযোগ: ০১৫৫২৪১৯৪৪২, ০১৭১৮৭৬০৮৪৮, ০১৭২০৩০১৬৩০

ই-মেইল: charbak.com@gmail.com
ডিজাইন: ক্রিয়েটর