মানস সান্যালের ‘তারার আলোয় কোনো ছায়া হয় না’ থেকে কয়েকটি কবিতা

0

লেখকসম্পর্কেঃ
মানস সান্যালমানস সান্যালের 'তারার আলোয় কোনো ছায়া হয় না' থেকে কয়েকটি কবিতা
জন্ম ৩০ অক্টোবর ১৯৮২। বাবা মৃণাল কান্তি সান্যাল, মা সুমনা সান্যাল। ময়মনসিংহের সিটি কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে চলে যান ঈশ্বরগঞ্জে, মামার বাড়িতে। দিদিমা ডা. মঞ্জুরাণী বাগ্চীর অভিভাবকত্বে ঈশ্বরগঞ্জ পাইলট হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক, ঈশ্বরগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর আবার ময়মনসিংহে ফিরে আসেন। সরকারি আনন্দ মোহন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

পেশাগত জীবনের শুরু শিক্ষকতা দিয়ে। গৃহশিক্ষকতা। তারপর ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষক, একটি এনজিওতে প্র্যাকটিক্যাল ইংলিশের ইনস্ট্রাকটর হিসেবে কাজ করার পর ২০০৮ সালে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন।

লেখালেখির শুরু ২০০০ সালের গোড়ার দিকে। কবিতা দিয়ে শুরু। মাঝেমধ্যে গল্প, গদ্য, আলোচনা বা উপন্যাসে হাত দিতে দেখা যায় তাকে। তবে কবিতাই তার কাছে প্রথম এবং শেষ উপলক্ষ। জীবনকে দেখার উৎসব। ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তার প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘আহত জামার জন্য শোকপ্রস্তাব’।

স্ত্রী নিবেদিতা চক্রবর্তী। একমাত্র পুত্রের নাম ধীমান সান্যাল।

পরকীয়া

ছাদে শুকাতে দিয়েছ জামা আর এই ফাঁকে রোদ
ঢুকে যাচ্ছে তোমার জামার মাঝে, বুক ছুঁয়ে বয়ে গেল
জামার হাতার ভাঁজে লেগে লাগল আলজিবে;
এ-ও কি মেহন, এক অনন্য প্রেমের স্বাদ!

আমার জামাকে ঘিরে রোদের কামুক চোখ, ঠোঁট
ঠিক এইভাবে ঘোরাফেরা করে; বুকে, পেটে মুখ ঘষে
যেন কাল রাতে যে তোমাকে চোরাবালি থেকে
এনেছিলাম ডাঙায় টেনে তার ছায়া ঘিরে আজ রোদ
ছাদের ঈশ্বরী এসে জাঁকিয়ে বসেছে।

আশ্চর্য পরকীয়ার ঘেরাটোপে আমাদের বেঁচে থাকা
সংলাপের বদলে যেখানে রোজ পোড়ে
একান্ত গোপন কথা, শরীরের রহস্যবেহালা।

রোদ, জল সবই তোমার প্রেমিক- সুচতুর ও গোপন;
এতটা গোপন যে তুমি নিজেও জানো না তোমার অপ্রেম
ঘিরে তারা রোজ খেলে যায় রোজ হাওয়ায়,
রোদে আর অমোঘ বৃষ্টিতে;

রোদ, জল, হাওয়া- সবই আমার প্রেমিকা-
    একান্ত সংগোপনা।

এপ্রিল ফুল

এপ্রিল ফুলের কথা মনে পড়ে।

যে মেয়েটি চোরাজ্বর করোটিতে গুপ্ত রেখে
আমাকে বেকুব বানাবে বলে জ্বরতপ্ত লেবুর বাগান থেকে
তুলে নিয়েছিল কয়েকটি পাতা,
দুই-চক্রযানে জুড়ে দিয়েছিল
কথা ও সুরের পোস্টকার্ড:
        I just called to say I love you
তার কথাও মনে পড়ে।

এখনো লেবুর বাগান থেকে গন্ধের ডানায় উড়ে
রাত্রি ও রাত্রির আসমান ঘরের দুয়ারে উঠে আসতে চাইলে
মনে পড়ে সবুজ কালিতে আঁকা চব্বিশটি লেবুপাতার কথা।

সে কোন দুর্দান্ত হাওয়ার প্রতাপে উড়ছে আজ,
কোন দুপুরের সিংহাসনে পালক চিহ্নিতা বসে আছে,
    কী অমোঘ বালিশের তুলায় তুলায়
    ডুবে গেছে জ্বরলাগা ওষ্ঠ ও সবুজ হস্তলিপি!

কান্না নয়, হাসির কোরাস নয়,
পুলকের তারালতা গাছ ফুটে ওঠে দুই চোখে

ভাবতে ভালোই লাগে, এপ্রিল-বোকাদিগের আমি অন্যতম।

উদ্যত ফণার নিচে

কেবল কান্নার কাছে ভেঙে পড়ে মিছিলের সমস্ত স্লোগান

কান্নায় জন্মায় এক অশ্রুজলাধার। জলে সব ধুয়ে যায় এমনকি
স্নান নিজে যায় ডুবে। কিন্তু রক্ত, লাল ফল্গুধারা যা ক্রমশ
জীবনের দিকে টেনে নিতে চায় তাকে জল দিয়ে মোছা যাবে!
যাবে না, যাবে না, জানি। ‘পৃথিবীর তিনভাগ জলের সমান’
অশ্রুকুণ্ডলী জমিয়ে তোলো তোমরা, শোকার্ত আত্মীয়স্বজন,
কান্নার মুহূর্ত শেষ হয়ে আসে একদিন অথচ বেদনা চিরস্থায়ী।
ক্ষতের পাশেই ফুটে থাকে, দাগ হয়ে, স্মৃতি হয়ে, কাঁটা হয়ে
গোলাপের নিচে। তুমি ভোলো রং। মৃত্যু-বিষাদের জন্মগাথা
তোমাকেও পরিত্যাগ করে যায়। শুধু জেনো এই সত্য
বিধুরতা শেষ করে উঠে আসে কালো কালো সর্বনাশা ঢেউ-

উদ্যত ফণার নিচে কখনোই নিরাপদ নয় মিছিলের কেউ।

কঙ্কাল

আমাদের গল্প থেকে এক অন্তিম নিশ্বাস উড়ে
গিয়ে তোমাকে জড়িয়ে ধরে। তুমি বলো,
আমার পায়ের নিচ থেকে কার্পেট ছিনিয়ে নেয়া
কোন কথা-জাদুকর তুমি, এখন কী করে আমি
মাটিতে রাখব পদতল, কোন বাল্বের আলোয় দেখব
নিজের শরীর থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে তাম্ররশ্মি,
গুহামানুষের স্বপ্ন নিয়ে সুর রচনা করছে
পরিত্যক্ত নির্জন গিটার!
    আমার জঞ্জালে আমাকেই ছুড়ে দিয়ে
    এ কোন কথার কলিঙ্গ সম্রাট তুমি
    নোনাবালি পার হয়ে সমুদ্র ডিঙিয়ে যাও
    প্রতিটি সূর্যাস্তে?

আমি শুধু বলি,
তোমাকে হারাব বলে হাত ধরে গেয়ে যাই গান
                তোমাকে পাওয়ার!

স্থাণু

ফিরেই আসতে বলি। এত ঝড় বাড়িঘর, উঠানের ওপর দিয়ে বয়ে যায়, রোজ ভোরে নিজেকে দেখার আগে একবার দেখতে হয় ভাঙা আয়নার টুকরো টুকরো মরদেহ। যেন কেউ কাপড় ছিঁড়তে এসে ভুল করে আয়নাই ছিঁড়ে গেছে।
    তবু দিনের মোহ। তবু
আরো একটি সকাল দেখা যাবে বলে
দুই হাত আকাশের দিকে তুলে দিয়ে বলি,
হে প্রভু, নশ্বর ও অবিনশ্বরের বিধাতা,
আমাদের অসংখ্য সকাল দাও,
আরো ঝড় থাকে, থাকুক, অনেক ঝোড়ো বায়ু
অমিত প্লাবন ঘিরে জমে ওঠা মেঘ-
সকলই থাকুক, তবু মৃত্যুর আগে যেন
আঙুলের কড় গুণে বলা যায়, এ জীবনে
রাত্রির চে’ সকালের সংখ্যা ছিল বেশি!

ফিরে এসো হে আয়না ভাঙার কারিগর। পাথরের সাথে পাথর ঠুকে ঠুকে আগুন জ্বালাতে শিখে গেছি এক রাতে। সেই আগুনেই দেখেছি নিজের মুখ; মাতৃজরায়ুর অন্ধকার কাকে বলে, কাকে বলে বাবরের প্রার্থনা। পিতা হলে প্রতিটি পুরুষ সম্রাট বাবর হয়ে যায়;
মাতা হয় বিলুপ্ত অক্ষর
মোম আর পিদিমের আলোয় তাকে চিনে নিতে হয়,
প্রতিটি মায়ের কাঁধে এই বিমূর্ত সভ্যতার
প্রতিলিপি আঁকা আছে জেনে বলি,
ফিরে এসো হে মাতৃবন্দনার অনন্ত সংগীত;
কেবল মায়ের কাছে এক থোকা জোনাকির আলো পাওয়া যায়।

আর সব ভূমিস্তূপ। অসামান্য কোনো কিছু নয়।

ফাঁদ

এখানে প্রেমের নামে পাতা আছে ফাঁদ,
বাদামি জ্যোৎস্নার মাঠজুড়ে
ডোরাকাটা বিদ্যুতের ছায়াছবি।

ফাঁদ মানে আরো কিছুকাল
গহিন ঘুড়ির মধ্য-আসমানে ভেসে থাকা,
সামান্য সুতায় ভরে দেয়া শেষ রক্তবিন্দু,
পুষ্পের ভেতরে রেণু হয়ে জন্মানোর সুবর্ণ সুযোগ।

অনেক পুরুষফুল বাগানের মাঝখান থেকে
মক্ষিকার উড়ে যাওয়া দ্যাখে,
হাসে
বাতাসে ভাসিয়ে দ্যায় দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস,
আহা, কী মধুর ওই মধুপলায়ন!

বাদামি জ্যোৎস্নায় জেগে ওঠা মাঠে যখন ফুটল
বিদ্যুতের লীলাভূমি, তখন সে ফুল, সংকুচিত পুরুষ গোলাপ
কী ভাবে ডোরাকাটা দাগ নিয়ে, তুমুল প্রবাহ নিয়ে উড়ালের!

মুছে যাওয়া মধুকোষ, লুপ্ত অক্ষরের রূপ নিয়ে জেগে থাকে
হাড়ে ও মজ্জায়। তাই মাঝে মাঝে ভাবি
ফাঁদে আর থেকে কী লাভ, তারচে’ বরং ভালো
বিদ্যুতের মাঠে আলোক বকুল হয়ে ফুটে থাকা।

আমি ও সন্ধ্যা

তারপর সবাই তোমরা চলে গেলে একা একা বিপন্ন নদীর বাঁকে
বসে দেখি কীভাবে আরম্ভ হয় তারকা-যুগের। রাজহাঁসগুলো
একে একে নিস্তরঙ্গ জল থেকে গা মুছে উঠে যায় আর শূন্যস্থান
পূর্ণ করে দিতে আসে একটি নক্ষত্র; মানে নক্ষত্রের জলবিম্ব।
দেখা যায় আলোপ্রভা, দেখা যায় আধো-অন্ধকারে জলও নর্তকী হয়ে ওঠে।
নিতম্ব দোলায় আর ক্রমাগত বেড়ে যায় তারাদের প্রতিলিপি।
আমি তো আসলে জলের প্রেমিক নই। সে-ও নয় আমার প্রেমিকা।
বানভাসি মানুষেরা জানে জলের কামনা কতটা দুর্বার।
তারা থেকে তারায় উড়িয়ে নিতে চায় দেহ; মাচা ভাঙে, ভাঙে দুগ্ধপথ।

তোমরা সবাই একে একে চলে গেলে দেখি, বিষণœ নদীর
বুকেও কীভাবে ডুবে যায় চরাচর, তারকাবহুল রাত।
ঢেউয়ে ঢেউয়ে ওঠানামা করে বহুদূর থেকে উড়ে আসা তারার সামান্য প্রভা।
যেন আলোই না। মেরুর প্রদেশ থেকে লেখা চিঠি।
এতটা বরফ আর তুষার পেরিয়ে আসতে আসতে
শীতে ও ঝড়ের উতরোলে ছিঁড়ে গেছে খাম। অবশেষে চিঠির পাতাও।
কিন্তু প্রকৃত অক্ষর তার নির্দিষ্ট গন্তব্যে ঠিক পৌঁছে যায়।
তারাগুলো চিঠি পায়, পড়ে ও পাঠায়।

তোমরা সবাই ঘরে ফিরে গেলে ওই অক্ষরগুলোই ধীরে ধীরে ভেসে ওঠে
বিষণœ নদীতে, যেখানে আমি ও সন্ধ্যা পাশাপাশি ঢেউ গুনে,
স্রোত গুনে সময় কাটাই।

স্তব্ধতর পথ

স্তব্ধতর পথের দিকেই প্রিয় পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত;

আমি বাক্যদানবের প্রচলিত থাবা থেকে তোমাকে ছিনিয়ে আনবার
কী প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছি দ্যাখো শব্দরেণু! ছিনিয়ে আনছি লোহিতকণার
ধুলো। পাড়িয়ে রাখছি ঘুম ময়লা নোটখাতায় যেন শব্দগুলো প্রেমিকার
একেকটি চুল, চিরুনির আগ্রাসনে ঝরে গেছে আর ঝরে যাওয়ার পর
থেকে একটানা কেঁদে যাচ্ছে।

ওই খসে যাওয়া চুল ধরে একদিন ঠিক পেয়ে যাব তার মুখের সাক্ষাৎ
পেয়ে যাব শরীরেরও। এই ভেবে সংসারের সব শোক তুলে রাখি
ব্যাককভারের গায়ে।

মলাটে বাঁধানো খাতা। দুই মলাটের মাঝখানে কিছু উদ্ধারকৃত অক্ষর
অবিরাম নাচে, গল্প ও গুজব করে অচিন্ত্য ভাষায়। ওগো শব্দপাখি,
তোমাদের ভাষা কোনো দিন শিখি নাই; বুঝি নাই সমস্ত সংলাপের
ঠিক মাঝখানে কেন হাসি ও ঠাট্টার তোড় বয়ে যায়!

আড্ডাবাজ নই আমি। মাঠের দূর্বায় যখন অশ্বদল মুখ ঢেকে নেয়
শুনি চিৎকার প্রতিটি ঘাসের ঠোঁট থকে উড়ে উড়ে আসে
তবে কি ওরাও প্রেমিকার খসে পড়া চুল, চিরুনির অত্যাচারে ঝরে গেছে!

নিধনযজ্ঞ ব্যতীত উৎসব জমে না সঠিক; তাই ভাবি, আমি নিজে
উদ্ধারকর্তার চরিত্র ধারণ করে আসলে নীরবে শব্দঘাতক এক,
একে একে ছিনিয়ে আনছি শব্দের অর্ধেক দেহ, শত্রুদানবের ডানা ভেঙে!

নিজেও চলেছি হেঁটে স্তব্ধতার দিকে কেননা সকল উৎসব একদিন শেষ হয়ে যায়,
পড়ে থাকে ভাঙা চুলা, পোড়া কাঠ, অগ্নিনিতম্বের ডামাডোলে
অনেক মুহূর্ত ছাই হয়ে উড়ে যায় গ্রহ-তারকার দিকে।

পিতা ও পুত্র

– এক দশ তিন
তেরো
এক দশ চার
চৌদ্দ  
এক দশ পাঁচ
বাবা, তুমি পড়তে পারো!

– পারি না পড়তে।
কেননা আমার জন্ম অন্ধ রজনীতে
চারপাশ ডুবে গিয়ে শুধু জল, শুধু
ঢেউ উঠে এসেছিল ঘরে।
মা বললেন, চোখ বন্ধ কর, সোনাধন,
তা নইলে ডুবে যাওয়ার দৃশ্য সারাটা জীবন
দুই চোখে লেগে থাকবে তোর।

সেই থেকে চোখ বন্ধ করে বসে আছি জানালার কাছে;
জন্মান্ধ তো নই;
খেজুর কাঁটার বীভৎস আক্রোশ কেউ ঢেলে দেয়নি চোখে
তবু বুঝি অন্ধ।
কেননা খুললে চোখ মনে হয়, মাতৃশরীরের ভেসে যাওয়ার দৃশ্য
দেখতে দেখতে কেটে যাবে এই জন্ম।

– পৃথিবীর সমস্ত অক্ষর
কালো কালিতে মুদ্রিত কেন হয়, জানো!

– এটুকুই জানি শুধু। আমার চোখের অন্ধকার
বিলি ও বণ্টন করে অক্ষরের দেহগুলো কালো হয়ে গেছে।

প্রকাশনা সংক্রান্তঃ
তারার আলোয় কোনো ছায়া হয় না । মানস সান্যাল । প্রকাশকঃ মেঘ । প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬ । প্রচ্ছদশিল্পীঃ তৌহিন হাসান । মূল্যঃ ১৪০ টাকা ।

মন্তব্য

টি মন্তব্য করা হয়েছে

logo-1

চারবাকগণ: রিসি দলাই, আরণ্যক টিটো, মজিব মহমমদ, নাহিদ আহসান

যোগাযোগ: ০১৫৫২৪১৯৪৪২, ০১৭১৮৭৬০৮৪৮, ০১৭২০৩০১৬৩০

ই-মেইল: charbak.com@gmail.com
ডিজাইন: ক্রিয়েটর