সাম্য রাইয়ানের ‌’বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ থেকে কয়েকটি কবিতা

0

ব্যাক কভারঃবিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা । সাম্য রাইয়ানের প্রথম কবিতার বই
ঘটনার বয়ানসূত্র থেকে আলো ছড়ানো একটা কথামুখ দেখতে পাচ্ছি। নদীফলে ভেসে যাচ্ছে তীর, ঘনবুনটের জাল ভরে উঠেছ ব্যর্থমাছে। গানবাহী শামুকপুত্র চিনে নেবে মহাকাল, পৃথিবীর ছায়া। নিবিড় দৃশ্যের মিউজিয়ামে দাঁড়িয়ে তবু একজন কবি, একা; তোমাপৃষ্ঠের নিচে প্রাণপ্রবাহের উপর একই সমতলে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। গ্যালনসম বিষাদ শুধু বেরিয়ে আসে কলমের ডগা দিয়ে। একবার বিষাদ লিখে আমি কলমের নিব ভেঙে ফেলি। পূর্বনির্মিত পশমী জঙ্গল থেকে কাগুজে শরীরে শাদায় লেপ্টে যায় দীর্ঘ হতাশার মতো ম্লাণ উপাখ্যান। কী করে নির্মিত হয় কবিতাগাছের ফল; মানুষের কাছে আজ অব্দি সে সব অমিমাংসিত বিষ্ময়!

মহাকোলাহল

পূর্বরাতের ভয়াবহ মৃত্যুভাবনা পকেটে নিয়ে ঘুরছিলাম রাতে। দেখি, মানুষের কতো বিচিত্র জীবন; সানাই বাজাচ্ছে বিয়ের। বলুন তো, জীবনের ফলাফল কী? টোপর পরে বন্ধুদের সাথে একটা ছেলে হাসছে। টোপর পরে বন্ধুদের সাথে একটা মেয়ে কাঁদছে। বৃক্ষহীনতার ফলাফল জানা আছে আপনার? আমি মাতাল হলেই যতো দোষ! এতোগুলো কাগজের পিঠে চেপে বসেছি তো বাড়ি যাবো বলেই। আমি কি তুচ্ছ ফড়িঙ? কোথাও কোনো অন্ধকার নেই কেন এতো রাতেও বুঝিনা কী যে হলো মানুষগুলোর। পথে পথে পথঘাটে কোনো তীব্র নারীগাছ নেই কেন? আমার খুব দৌড়াতে ইচ্ছে করে। মাথায় ইতোমধ্যে দৌড় শুরু হয়েছে, শিরা-উপশিরা পাগল হয়ে যাচ্ছে; আমি স্থির হচ্ছি; এভরিওয়ান ইজ আ ক্রিমিন্যাল! কতো বৈধ অবৈধ প্যাকেট-বোতল শূন্য থেকে ভেসে শূন্যে চলে যাচ্ছে। আমার যেন কাকে ডাকতে ইচ্ছে করছে গোপনে। মুঠোভর্তি তেঁতুল আর নুন নিয়ে আমার যেন কোথায় যেতে ইচ্ছে করছে! কেন আমার আবার জন্ম হলো পৃথিবীতে, কেউ কি জানে? তোমার বাড়ি তো বহুদূর- তবে আপেলের ঘ্রাণ ভেসে আসছে কোত্থেকে? তুমি কি আমার পাশে – আছো – কাছাকাছি কোথাও, বৃষ্টির আড়ালে। এই দিন তো পুরোটাই উষ্ণ ছিলো আজ, কেন এভাবে বৃষ্টি এলো?

মেশিন

আবার প্রথম থেকে, নতুন করে লিখছি পুরোটা
বিগত সময়ের কর্মকে কেটেকুটে, ব্যাপক
কাটাকাটি হলেও নতুনে রয়েছে ছাপ, পুরানের

চিহ্নিত হচ্ছে ধীরে, না-লেখা কলম, তেলের কাগজ
তা-হোক, তবু আবিষ্কৃত হোক প্রকৃত যাপন…

আদিম শ্রমিক আমি; মেশিন চালাই।
মেশিনে লুকানো আছে পুঁজির জিন
চালাতে চালাতে দেখি আমিই মেশিন

রূপমকে
উৎসর্গ: সুবোধ সরকার

ওর জন্য আমার মায়া হয়
ওকে দেখলে আমার অজান্তেই
মুখ থেকে বেরিয়ে আসে
মুহুর্মূহু শান্তনাবাণী।

ব্যস, এ পর্যন্তই; এর বেশি
আর কিছু চাইবেন না প্লিজ।
ওকে তো আর চাকরী দিতে পারবো না!

জানি রূপম এমএ পাশ।
চাকরী জোটাতে না পেলেও
একটা প্রেমিকা জুটিয়েছিল ছেলেটা।

একটা চাকুরী ওর খুব দরকার ছিল
কিন্তু কী করি বলুনতো!
আজকাল চাকরীর যা বাজার
তার চেয়ে ছেলেটা মাছ চাষ করতে পারতো
অথবা আমাদের প্রোপিতামহের মতো
উর্বর ভূমি কর্ষণ করতো!

এসব করলোনা ছেলেটা।
এই বাজারে চাকরী করার চেয়ে
আত্মহত্যা করা অনেক সহজ।
আর মানুষতো সহজ কাজই করতে চায়।

বাতাসের আগে জ্যাঠা বলেছিলেন আমাকে,
‘রূপমকে একটা চাকরী দাও
এমএ পাশ করে বসে আছে ছেলেটা’।

আমি আর সহজ কাজ কোত্থেকে দেই বলুনতো!
এই দুর্মূল্যের বাজারে আত্মহত্যার চেয়ে
সহজ কাজ কে-ই বা দিতে পারে?

আর কে রোডের কবিতা

অনুকরণযোগ্য মনে হয়নি কাউকেই, আধুনিক

মানবিক গভীরতা বাড়ে নাই যদিও
আমি আর নদী তবু হাত ধরাধরি করে
শব্দের আনাগোনা দেখি

চারপাশে মৃতের আর্তনাদ
আর কে রোড ধরে।
যতোবার বুঝতে চাই – আক্রান্ত মুদ্রা
ছুটে ছুটে যায়-আসে;
আর কে রোড ধরে মনে হয়
বুমেরাঙ

পৃথিবী সিরিজ

এই অন্ধগুহা থেকে আমি
কী করে বেরোই বলোতো!
মুখবন্দি মাটির কলোসের মতো
এই গুহা রাত্রিময়।

সুরচালিত একটা বিমান
কেউ আমার কাছে পাঠাও।

দুই
হাওয়াঘর ছিলো সারিবদ্ধ;
ভুল করে ঢুকে পড়েছি
ভুল কেবিনে। ঘোর কেটে গ্যাছে
‘পৃথিবীর গাড়িটা থামাও
আমি নেমে যাবো।’

তিন
পৃথিবীতে প্রবেশের গুহামুখ নিয়ে
বিবিধ অভিক্ষেপ ছিলো বলে
ভয়ার্ত, নেমন্তন্ন করোনি কখনো।
অথচ কতো রায় সেখানে
জীবনবস্ত্রসমেত অবস্থান নিয়েছে!

চার
আপাত মনে হয় কতো কাছাকাছি
নিকটবর্তী এই সবকিছু, পরস্পর।
অথচ উল্টোদূরবীনে রাখো চোখ
কতো পরিষ্কার দ্যাখো
কতো মূর্ত হয়ে ওঠে দূরত্বরেখা!

পাঁচ
অতর্কিত বেজে উঠলে বিকারগ্রস্ত
ভায়োলিন, অপ্রস্তুত নীল ফড়িঙগুলো
চমকে ওঠে চলন্ত ছবি থেকে।
দ্বিধা সংক্রমিত হলে দূরে
অপলক তাকিয়ে থাকে কাঠের হরিণ।

ছয়
বৃত্তছায়া দেখে এগুচ্ছো ক্যানো
ওর পেছনে পৃথিবী নেই তো;
কোথায় ভরবে চাকু, পুরোটাই ব্ল্যাকহোল।
আর আত্মসীমানা ছাড়িয়ে
ও এখন বিকাশোন্মুখ, প্রলয়ঙকরী..

সাত
সবুজ পাতাবাহারের দিকে তাকাও
ধীরে ধীরে পুড়ে যাও সুন্দরের উত্তাপে।
যখন ভোরের চূর্ণ অবশেষটুকুও
অবশিষ্ট নেই আমাদের জন্য
পবিত্রতার আশ্রয় দেবার।

আট
এখনো কিছু স্মৃতি ছড়ানো ছিটানো
অবহেলে পড়ে আছে পৃথিবীবারান্দায়।
ছাউনির ঠিক নিচেই আমাদের
বিগত জন্মের ভোর ও সন্ধ্যার স্মৃতি
মরামাছের মতো চুপচাপ।

নয়
মাথার সীমানা থেকে অনেক দূরত্বে
উচ্চতায় একটা আকাশ ঝুলছে;
বাতাসে ঝাপটা লেগে মৃদুমন্দ দুলছে।
আমার ব্যক্তিগত পৃথিবীতে কোনো আকাশ
নেই, পুরোটাই শরের আস্তর।

দশ
খোসা ছাড়ালেই বেরিয়ে পড়ে গোলাকার
আস্ত পৃথিবী; পূর্ণবৃক্ষজুড়ে
ছড়িয়ে পড়ে প্রিয় হরিণীর অর্ধমিথ্যা কথামালা।
জরাগ্রস্ত কুয়াশার ফলে কলমখাতা
হারিয়ে ফেললাম লেপমুড়ি দিতে।
ধুর, অসীম বিরক্তিউৎপাদক হাওয়াকল
আমদানী হলো না বলেই!
শীতকাল ক্যানো এলো ঝিমলি?

এগারো
কিছু শব্দ আমি লুকিয়েছিলাম তোমার
গোপন গুহায়, আমার ব্যক্তিগত পৃথিবীতে।
মৃদু শব্দেরা খুব দূরন্ত হয়েছে
আজকাল, ঘরবাড়ি তছনছ করে।
আমার পৃথিবী হ’লো উল্টোপালক
ভেঙে তছনছ – শ্রী একাকার!

পাগল হওয়ার সহজ উপায়

দুর্গার পায়ের কাছে
আমি চাই আগুনের তুমুল উত্থান।

এর থেকে সহজ গণিতসূত্র শিখিনি এখনো।

ছাইয়ের খেয়াল
বখাট্য সংলাপ।

প্রতিবেশি দাঁড়িয়ে আছেন ডালিমফুল নিয়ে।
যাবো ভেবে
বোতল থেকে বোতলে লাফাতে অ-পার
হয়ে গেছি অঘোষিত মেঘদল।

চোখ খুলতে পারি না; মন ভেঙে
পড়ে আছে বাস্কেটে।

বাস্কেট, বোকা বলের সহোদর।

উজ্জয়িনীকে

তামাক ফুলের দেশ – রসুনের বন
ক্লান্ত কুটোপণ্যের পসরা অথবা
নবীন মৃত্যুগন্ধা বিছানায়; কোথাও
থেকোনা লীন। এমনই কতোদিন
নদীফলের দেশে কতো মেয়ে ঢেউয়ের
চূঁড়ায় ভেসে – চলে গেছে দূর-তেপান্তর।
তোমারই মতো তারা ঘুমের ভেতরে নেমে এসেছিলো
বেড়ালের ডানা থেকে রূপোলী রাত্রিতে।
অচেনা ডাকাতেরা লুট করে গেছে
আমাদের
অগণিত
গোলাপী পাপড়ির মতো ভোর।
সেইসব বেদনা ফোটার দিনে একটা দূরাগত
প্রতীককে সঙ্গীতে রূপ দিতে দিতেই
অনাহুত দিনগুলো পেরিয়ে যাচ্ছে!

শাদা প্রজাপতি

এইখানে আমি একা, নিঃসঙ্গ পরিব্রাজক।
তারপরও সে আছে এখানেই
মাড়াইকৃত চালের মতো শুভ্র শরীর নিয়ে
এখানেই কোথাও সে রয়ে গেছে
অপ্রকাশিত প্রজাপতি হয়ে।

শাদা প্রজাপতি এক জীবন্ত এরোপ্লেন।
হাত বাড়ালেই তার উন্মাতাল গান
উঠে আসে হাতে কান্নার সুর।

প্রকাশনা সংক্রান্তঃ
বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা  ।  সাম্য রাইয়ানের প্রথম কবিতার  বই  ।  প্রথম  প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ । প্রচ্ছদ : রাজীব দত্ত । শব্দবিন্যাস : নান্দনিক, কুড়িগ্রাম । প্রকাশক : রাশেদুন্নবী সবুজ, বাঙ্ময় প্রকাশনা, বাংলাদেশ।
বিনিময় : ৫০ টাকা

মন্তব্য

টি মন্তব্য করা হয়েছে

logo-1

সম্পাদনা পর্ষদ: রিসি দলাই, আরণ্যক টিটো, মজিব মহমমদ, নাহিদ আহসান

যোগাযোগ: ০১৫৫২৪১৯৪৪২, ০১৭১৮৭৬০৮৪৮, ০১৭২০৩০১৬৩০

ই-মেইল: charbak.com@gmail.com
ডিজাইন: ক্রিয়েটর