আর্টিস্ট । নাজমুস সাকিব রহমান

0

মাকসুদুল সাকিব আমার বন্ধু মানুষ। সে ছেলে হিসেবে খুবই ভালো— লোকমুখে এরকম কথা প্রায় শোনা যেতো। অন্তত স্কুল জীবন থেকে এ নিয়ে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। বিশেষ করে আমাদের দুজনের নামের মিল থাকায়, শিক্ষকদের ভালো-মন্দের উদাহরণ দিতে ভীষণ রকম সুবিধা হয়েছিল।

সে ক্লাসে দ্বিতীয় বেঞ্চে বসতো, আর আমি পঞ্চম বেঞ্চে। মূলত, এই ক্ষেত্রে আমাদের দূরত্ব মাত্র তিন বেঞ্চ! অথচ শিক্ষকরা তা বুঝতেই চাইতেন না। এখন অবশ্য আর বোঝার দরকার নেই, দুজন দুই ভার্সিটিতে পড়ছি। আমাদের আগের মত তেমন দেখা হয় না ।

যা- হোক, ছেলেটির ভালো ইমেজের ওপর শনির দশা পড়েছে। ইদানীং অনেকে তার ওপর ঠিক ভরসা পান না । আর যারা তাকে শোনা কথায় বিশ্বাস করেছিলেন, সে জন্য তারাও এখন নিজের প্রতি বিরক্তবোধ করছেন । তার ক্লাসের মেয়েরা তো খুব অবাক, ছেলেটির কী যে হল! আগে তাকে মাথা নিচু করে হাঁটতে দেখা যেতো । আর তা দেখে মেয়েরা বলতো— “ঐ দেখো, মাকসুদুল সাকিব পায়ের আঙুল গুনছে।”

সে-ই মাকসুদুল সাকিব এখন ক্লাসের প্রত্যেকটা মেয়ের দিকে এমন ভাবে তাকায়— যেন এই প্রথম সে মেয়ে দেখেছে, এর আগে পৃথিবীতে মেয়ে ছিল না ।

বন্ধুদের কাছ থেকে ওকে নিয়ে নানা রকম গল্প শুনি । প্রায়ই বিশ্বাস হয় না, তবুও বিশ্বাস না করে উপায় কী! যা রটে তা কিছুতো ঘটে ।  তবে, এই মুহূর্তে যে গল্পটা সবচে’ বেশি শোনা যাচ্ছে, তা হল—

মাকসুদুল সাকিব একদিন ক্লাসে যাওয়ার জন্য বের হয়েছে, কোন রিকশা পাওয়া যাচ্ছে না বিধায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে— এমন সময় রাস্তার ওদিকটায় অপূর্ব একটা মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল । মেয়েটাকে দেখে তার মাথায় প্রথম যে প্রশ্নটি এলো, তা হল— পটলচেরা চোখ কি একেই বলে? মেয়েটির সঙ্গে তার মা ছিল, তিনি সিএনজি দেখলেই থামাতে চাচ্ছেন। হয়তো বা তাদের বাসায় যাওয়ার প্রচণ্ড তাড়া, কিন্তু ট্যাক্সি পাচ্ছেন না । প্রয়োজনের সময় সব কী আর সাথে সাথে পাওয়া যায়!  

যা হোক, মাকসুদুল সাকিব ক্লাসের কথা ভুলে দীর্ঘক্ষণ মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো । আশ্চর্য! মেয়েটি একবারও তার দিকে তাকায় নি ।

অথচ মাকসুদুল সাকিবের হাতির মতো শরীর, হাসলে একত্রিশটা দাঁত দেখা যায় । বত্রিশটি দাঁত থাকার কথা থাকলেও একটি কম আছে । এর কারণ অবশ্য আমি । স্কুল জীবনে ওকে ভালবেসে একটা চড় মেরেছিলাম, তখনই সে একটি দাঁত আমাকে উপহার দিয়েছিলো। সে নাকি ঋণ রাখে না ।

মেয়েটি না তাকালেও মেয়েটির মা সিএনজি থামালো ভুলে, হতাশ দৃষ্টিতে অপরিচিত ছেলেটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন । সম্ভবত তিনি নিজেও নিজের মেয়েকে কোনদিন এতো মনোযোগ দিয়ে দেখেন নি ।

   ঘটনাটি তার চরিত্রের সাথে ঠিক যায় না । তবুও ঘটনাদের কেন জানি তার সঙ্গে যেতে হচ্ছে । এরকম দৃশ্য না কি শুধু মেয়েদের সঙ্গেই ঘটছে না, ছেলেদের সঙ্গেও ঘটছে । এই তো কিছুদিন আগে ফেসবুকে সমকামীদের সমর্থন করে তাকে রেইনবো ছবি আপলোড দিতে দেখা গিয়েছিলো । হয়তো বা তারই কোন সাইড এফেক্ট ।

 আমি কথাটা উড়িয়ে দিচ্ছি, এমন সময় নিশা বলল— ‘ঘটনা কিন্তু তা না, আরও সিরিয়াস।’  

 নিশা আমাদের দুজনেরই বন্ধু, তবে, এখন সে আর মাকসুদুল সাকিব দুজনই একই ডিপার্টমেন্টে পড়ে, মানে ওরা দু’জন ক্লাসমেট ।
সে বলল— “পরশুদিন ক্যাম্পাসে আমি আমার বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে ঘুরছি, এমন সময় মাকসুদুল সাকিবের উদয়; যেহেতু তাদের পূর্ব পরিচয় নেই, আমি পরিচয় করিয়ে দিলাম । ভাবলাম, এর পর সে চলে যাবে । অথচ সে দাঁড়িয়েই রইল! তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতিতে তো আর প্রেম করা যায় না! এক পর্যায়ে সে আমার দিকে তাকিয়ে সামান্য নিচু গলায় বলল— ‘তোর বয়ফ্রেন্ডের চেহারার সাথে ছাগলের সামান্য মিল আছে । আচ্ছা সে কি ম্যা ম্যা করতে পারে?’
আমি বললাম— ‘পাগলের মতো এসব কী বলছিস!’, সে বলল— ‘তুই ওকে জিজ্ঞেস কর, ম্যা ম্যা করতে কাঁঠালপাতা লাগবে কি-না, আমাদের ক্যাম্পাসে প্রচুর কাঁঠালগাছ, প্রয়োজন হলে পাতা এনে দিচ্ছি । ব্যাটা, ছাগল ।’

এ কথা বলেই সে হাঁটা দিলো, আমি আমার বয়ফ্রেন্ডকে বললাম— ‘তুমি কিছু মনে করো না, সে ঠাট্টা করেছে । এখন চলে যাও ।’  

বিশ্বাস করবি না, কিছুক্ষন পর মাকসুদুল সাকিব সত্যি সত্যি কাঁঠালপাতা নিয়ে উপস্থিত!”

ঘটনা এতোদূর গড়িয়েছে তা আমি জানতাম না । তবে, গতকাল সকালবেলা মাকসুদুল সাকিব আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলো । ওর কিছু কথাবার্তা শুনে আমি পুরোপুরি গৌতম গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলাম ।

সে আমাকে পটল চোখের মেয়েটির গল্প বললো । মেয়েটিকে দেখে তার নাকি মনে হয়েছিল, তখনই হয়তো পটল তুলবে ।
এক পর্যায়ে মৃত্যুর সাথে পটলের সম্পর্ক কী তা জানতে চাইলো । আমি ওকে বললাম— ‘পটল গাছের সবগুলো পটল তুলে ফেললে গাছটি মারা যায়, তাই পটল তোলা মানে মৃত্যু ।’

অনেকদিন পর দেখা হলে, মানুষ সব কথা একসাথে বলার চেষ্টা করে । তাই কিছুক্ষণ কথা বলার পর তেমন কথা খুঁজে পাওয়া যায় না ।

এ সময় আমি ওকে বললাম— ‘তুই এসব উল্টোপাল্টা কাজ কেন করছিস?’ সে বলল— ‘বুঝলি, একটা জিনিস মাথায় ঢুকে না, আমাদের সবার চেহারার উপাদান তো একই । সেই চোখ, নাক, ভ্রু এসব ।

একই উপাদান দিয়ে যিনি এত ভিন্ন ভিন্ন চেহারা বানাতে পারেন, তিনি আর্টিস্ট না অন্যকিছু?’  

আমি ওর কথা শুনে প্রচণ্ডরকম ধাক্কা খেলাম ।

প্রতিটি মানুষের একটা সময়ে গিয়ে অনুসন্ধানে নামতে হয় । মাকসুদুল সাকিব হয়তো সে রকম কোন অনুসন্ধানে নেমেছে । আসলেই উত্তরটি জানা প্রয়োজন, কিন্তু আদৌ কি তা জানার ক্ষমতা মানুষের আছে?

মন্তব্য

টি মন্তব্য করা হয়েছে

logo-1

চারবাকগণ: রিসি দলাই, আরণ্যক টিটো, মজিব মহমমদ, নাহিদ আহসান

যোগাযোগ: ০১৫৫২৪১৯৪৪২, ০১৭১৮৭৬০৮৪৮, ০১৭২০৩০১৬৩০

ই-মেইল: charbak.com@gmail.com
ডিজাইন: ক্রিয়েটর