যখন কিছুই ভাঙ্গছে না, চালের বস্তা ভাসছে তখন || রিজবাহ রিজবী

0


সকাল সকাল একটা ফুরফুরে মেজাজে বের হলাম ভার্সিটি যাব বলে। বের হয়ে দেখলাম, বাইরে তুমুল বৃষ্টি। রাস্তায় তেমন গাড়ী নেই। প্রায় ফাঁকা রাস্তায় কয়েকটা রিকশা, সিএনজি এলোমেলো এদিক ওদিক যাচ্ছে, আসছে। রাস্তায় খিস্তি খিস্তি করতে করতে গার্মেণ্টস নারীরা বোরকা ভেজা শরীরে হেঁটে যাচ্ছে। কারো খিটখিটে শরীরের শুকনো হাড় ভেজা থ্রি-পিচের আড়ালে উঁকি দিচ্ছে।

না, না আমি ঐদিকে তাকাচ্ছি না। কারণ আমাকে ভার্সিটি যেতে হবে। ক্লাস আছে। খুব ইম্পোর্টেণ্ট ক্লাস।

কিন্তু গাড়ী তো নেই। অগত্যা একজন রিকশাওয়ালাকে বললাম— ১ নাম্বার যাবে? বেচারা ভিজে চুপসে গেছে। দেখেই মায়া হল। ঝির্ ঝির্ করে কাঁপছেও। নিয়ত করলাম মনে মনে যে, তাকে কিছু টাকা বাড়তি দিবই।

— হঁ যামু। উডেন। ট্যাহা কিন্তু দেড়শ।

— দেড়শ মানে? এই তো ৩০ টাকার ভাড়া, ভাই।

— দেড়শ মানি দেড়শ। গ্যালে উডেন, নাইলে মুই যাই।
এই বলে রিকশাওয়ালা মহোদয় প্যাডেলে পা দিতেই বললাম— ভাই সকালে তো অতো টাকা নিয়েও বের হইনি, ১০০ নেন। আমার একটু জরুরী যেতে হবে।

— আইচ্ছা উডেন।

প্রথম প্রথম ঝির্ ঝির্ করে কাঁপতে দেখে যত মায়া হয়েছিল, এখন তার দ্বিগুণ রাগ হচ্ছে। প্রায় রিকশাওয়ালা দেখি, সুযোগ পেলেই ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ তিনগুণ করে ফেলে। অথচ এদেরই জন্য আমার ভীষণ মন কাঁদে। এদের অপুষ্টিকর শরীরে যখন সমস্ত শিরা উপশিরা ভেসে ওঠে, আমার ইচ্ছে করে এক্ষুণি তাদের সমস্ত দুঃখ বেদনা শুষে নিই!

কিন্তু এরা বড় আহাম্মক। সুযোগ পেলেই …………………

কোন রকম ডিপার্টমেণ্টে পৌঁছলাম। তন্মধ্যে জিরো পয়েণ্ট থেকে ডিপার্টমেণ্টে পৌঁছাতে আরেক ভোগান্তি। সব সিএনজিওয়ালারা সিন্ডিকেট করেছে, এমন ঝড়-ঝড়-বাদল-দিনে তারা পূর্ব্বের তুলনায় প্রায় তিনগুণ ভাড়া না দিলে ডিপার্টমেণ্টে যাবে না!

কী আর করা! মনে হচ্ছে আজকে শুধু রাজত্ব ঝড় আর রিকশাওয়ালা-সিএনজিওয়ালার।

ডিপার্টমেণ্টে এসে দেখি, একেবারেই ফাঁকা। চারিদিকে সুনশান! বাহিরে বৃষ্টি ঝরার শব্দ এক নাগাড়ে সারোদ বাজার মত করে বাজছে।

প্যাণ্টটা ভিজে গেল। এই ভেজা প্যাণ্টে কেমন অস্বস্তি লাগছে। ঘিন ঘিন করছে সারা হাত পায়ে। অফিসের দিকে গেলাম। টুংটাং আওয়াজ হচ্ছে। হয়ত কোন শিক্ষক বা কর্ম্মচারীরা চা-টা খাচ্ছে।

ডিপার্টমেণ্টের সুইপারকে দেখলাম, ইয়া লম্বা ঝাড়ুটা নিয়ে ক্লাসে ক্লাসে ঝাড়ু দিচ্ছে। তারও প্যাণ্টের নিচের দিকে ভেজা। কিন্তু তবু, একটা খুশি খুশি মনে সেই ঝাড়ু দিচ্ছে। ক্লাসরুমের তালা খুলে দিচ্ছে। লাইটের সুইচ অন করছে। ঝকঝকে ক্লাসরুমের জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা ছু্ঁইয়ে ছু্ঁইয়ে পড়ছে।

ঐ যে সদ্যস্নাত বকুল ফুলের কপাল ছুঁইয়ে যেভাবে জলের ফোঁটা একটু একটু করে নিচে নেমে আসে, ঠিক ওভাবে জানালার কাচ বেয়ে বৃষ্টিজলের ফোঁটা নেমে আসতেছে।

আমাদের পরের ব্যাচের কয়েকজন ছেলে মেয়ে আসছে। তারা হল্লা করে ডিপার্টমেণ্টের বারান্দায় গোল হয়ে আড্ডা দিচ্ছে।

আমি অর্ব্বাচীনের মত এদিক ওদিক ঘুরতেছি। কখনো ক্লাসরুমে, কখনো বা অফিসরুমে কিংবা বারান্দায়।

আমার ব্যাচের কেউ বোধয় এখনোও আসে নি। কিন্তু কয়েকটা ব্যাগ দেখা যাচ্ছে। দুটো কি তিনটা তন্মধ্যে লেডিস ব্যাগ।

আমাদের ব্যাচে কাপল নেই। দু’জন দু’জন চারজন মানে দুটো কাপল আছে মাত্র। তারা আবার বৃষ্টি বাদলের দিন ক্যাম্পাসে পা মাড়ায় না। ঐ যে তারা প্রেমে তো সর্বদা-ই ভিজে থাকে, তো ভেজা পরিবেশে তাই জল, হাওয়া থেকে দূরে থাকে। কিছুটা শুষ্ক থাকে।
কাপল না থাকলে কি হবে? আমাদের ব্যাচে সাধারণত বেশ কয়েকটা গ্রুপ আছে। সবাই নিজ নিজ গ্রুপ মেইনট্যাইন করে।

মূলত ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যারা অসফল, তারাই কোন গ্রুপে স্থান পায় না। বিশেষ করে আমার মত অর্ব্বাচীন যারা।

বোধয় আমার ব্যাচেও কেউ কেউ এসেছে। ক্যাণ্টিনে হয়ত খেতেটেতে গেছে।

আমার করার বিশেষ কিছু না থাকলে বই পড়ি সাধারণত। কিন্তু আজ মানে এই জলনিমগ্ন আঁধার আঁধার আবহাওয়ায়, ভেজা প্যাণ্টে, চেয়ারে বসে বই পড়তে ঠিক মন চাচ্ছে না।

এই রকম একা এবং নিঃসঙ্গ কিছু মুহূর্ত্তের জন্যই বোধয় মানবজাতীর প্রেম করা দরকার হয়ে ওঠে। এই মুহূর্ত্তে উষ্ণতা দরকার। নিবিড় উষ্ণতা— যার নিঃশ্বাসে আমাদের শরীরের সমস্ত আর্দ্রতা মুছে যাবে। ঝির্ ঝির্ করে কাঁপতে থাকা শরীরে একটু তেজ, একটু গরম ছোঁয়া আসবে।

এইসব চিন্তা করতে করতে ডিপার্টমেণ্টের বারান্দার দক্ষিণ দিকে করে আমি ঠেস দিয়ে দাঁড়ালাম। যদিও উত্তরদিকে আমার জুনিয়র ব্যাচের কয়েকজন ছেলে মেয়ে, মোটামুটি ভীড় করে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে একা একা দাঁড়িয়ে থাকাটাও কিছুটা অস্বস্তির বটে, তবু আমি তো অর্ব্বাচীন, ওখানেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিপড়া দেখব ভাবলাম।

কিন্তু দেখলাম তাদের আলোচ্য বিষয় মোটাদাগে ফেসবুকে তার কত ফলোয়ার, কার ছবীতে কত লাইক পড়ে বা কাকে কতোটা ছেলে টেক্সট পাঠায় এসব! এই কথা, সেই কথার পরে এবার আসল খেলার কথা।

এখন ডিপার্টমেণ্টে বিভিন্ন ব্যাচে খেলা চলতেছে। তাদের কথা হল, এবার তারা ডিপার্টমেণ্ট ট্রফী জিতবেই। আবার একজন মেয়ে বলল, ফিজিক্স ডিপার্টমেণ্টে তার একজন বান্ধবী আছে। সাত সাতটা ছেলেকে একসাথে লাইন মারে। সবার সাথে রেস্টুরেণ্টেও ডেট করতে যায় নাকি!

তখন নাক চিবিয়ে পলকা ঝাউ গাছের মত একটা ছেলে বলে উঠল— এই আর এমন কি! আমি সেসব ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ প্রেমগুলো নাইন টেনে থাকতে করে ফেলেছি!

বারেব্বাহ! আমাদের প্রেমিক মহাশয়! তো এখন কয়জনের সাথে লাইন মারতেছ?
হিজাব পরা গোলাপিচেহারার একটি ছিমছাম শরীরের মেয়ে তার চিবুকে টোকা দিয়ে বলল। সবাই একসাথে হা হা করে ওঠল।

আমার অস্বস্তি লাগতেছিল বেশ।

প্রেম পিরিতি থাকবে, বিনোদন থাকবে কিন্তু তাই বলে ভার্সিটি পড়ুয়া একদল তরুণ-তরুণীরা কি সর্ব্বদাই ছিঁচকে প্রেম, ঠুনকো বিনোদন— খেলার ট্রফী; এসব নিয়েই থাকবে?

একটা চা খেতে মন চাচ্ছে। এমন বৃষ্টির দিনে মা খিঁচুড়ী রাধতো। না না ভুনা খিচুড়ী নয়। এখানে আমি যা খুশি লিখতে পারব বলে যে, ভুনা খিচুড়ীর বিলাসিতা লিখে মিথ্যা গল্প সাজাব, তা তো হতে পারে না!

একবার ভাবলাম ক্যান্টিনের দিকে গিয়ে একটা চা খেতে পারলে মন্দ হবে না!

সিড়ি দিয়ে নামবো তখন দেখলাম, আমাদের ব্যাচের কয়েকজন ভেজা ছপছপে প্যাণ্ট নিয়ে ঢুকতেছে। তারা ঐ যে তারা, যারা আবার গ্রুপ মেইনটেইন করে। আমাকে বিশেষ পাত্তা দেয় না। আসলে একজন অর্ব্বাচীনকে পাত্তা দেয়ারও বিশেষ কোন কারণ নেই।

আমাকে পাশ কাটিয়ে তারা কি জানি কথা বলতে বলতে ওপরের দিকে উঠে গেল। কয়েক সিঁড়ী ওঠার পরই শুনতে পেলাম, একজন হো হো করে হেসে ওঠেছে।

চারিদিকে মাছি ভন ভন করছে। মেঝেটা ভেজা স্যাঁতসেঁতে এবং ভেজা বালী, কাঁদাতে মাখামাখি। ধবধবে ফর্সা মোজাইক করা মেঝে কুচকুচে কালো হয়ে গেছে। এখানে বসে চা খাবো, তা ভাবতেই গা গুলিয়ে উঠছে। ক্যান্টিনের পূর্ব্বদিকে কয়েকজজনের জটলা। তারা গান ধরেছে। রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর লেখা— ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো।

আমার ইচ্ছে হল, ক্যান্টিনের এই নোংরা পরিবেশ নিয়ে বরং ডিন মহোদয়কে চিঠি লেখা যায়। মাছী, স্যাঁতসেঁতে মেঝে, ওয়াশরুশ থেকে কটু দুর্গন্ধও ভেসে আসতেছে।

তার ওপর ঐদিকে যারা চা-নাস্তা বেড়ে দিচ্ছে, তাদের লম্বা নখের ভেতর কালো ময়লা দেখেই আমার বমি বমি ভাব হল।

ধুর ছাই! আর চা-ই খাব না।

ঐদিকে ক্যান্টিনের দক্ষিণ পূর্ব্ব কোণে হাসছে চোখ ধাঁধাঁনো সুন্দরযুগল। বোধয় পুরো ক্যান্টিনের নোংরা পরিবেশটাকে নিজেদের রুপ দিয়ে ঢেকে দেওয়ার ইংগিত দিচ্ছে।।

চা না খেয়েই, মুখে তৃষ্ণা নিয়েই চলে আসলাম। আফসোস হচ্ছে আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার পরিবেশ নিয়ে। এই রকম নোংরা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আমরা কি সুস্থভাবে পড়াশোনা করতে পারব?

ডিপার্টমেণ্ট ফ্লোরে এসে দেখলাম, ঐ যে জটলাটা এখনো বহাল আছে। আমি বারান্দায় আর দাঁড়ালাম না। ক্লাসরুমের দিকে এগোলাম। দেখলাম, ইতোমধ্যে অনেকেই এসেছে। সবার চোখে একটা ঘুম ঘুম ভাব। কেমন আড়মোড়াই যেন বা ভাঙ্গলো না এখনো!

আমার পাশে সিটে বসেছে দেখলাম, রমজান।

— দোস্ত তুই কতোক্ষণ হল, এসেছিস? ম্লান এবং কিছুটা দুঃখ দুঃখ ভাব নিয়ে রমজান জিগেস করল।
— এই তো আধ ঘন্টা তো হবেই।
— অ আচ্ছা। আমার ছাতাটা খুঁজে পাচ্ছি না। আসলে এখানে রেখে নিচে ক্যান্টিনে গিয়েছিলাম। এসে দেখি, ছাতা নেই।

আহা রে! বেচারার চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছে না। এই পুরো ক্লাসে রমজানই কিছুটা আমাকে ভালবাসে মনে হয়। কিছুটা সময় দেয়। অনেক সময় আমার নাস্তার বিলও রমজান দিয়ে দেয়। যদিও আমি জানি, রমজানের বাবা নেই। পরিবারেরও সবার বড় সেই। টিউশন করে মোটামুটি যা পায়, তা দিয়ে নিজের খরচ চালায়।

— তুই ভালো করে দেখ। আর না হয় ডিপার্টমেণ্টের অফিসে বলে রাখ। যাতে কেউ পেয়ে অফিসে জমা দিলে, তোকে জানায়।

শুকনো মুখে রমজান চলে গেল।

চারিদিকে হৈ চৈ, চিৎকার চেঁচামেঁচি। বিশেষত এমন ঝড়ের দিনে, বৃষ্টির দিনে, মেয়েরা বেশী চিল্লায়।

আমি অনেক ভেবেছি, কারণটা বের করার। পারিনি।

এখন তো স্মার্ট ফোনের যুগ। অনেকেই দলবদ্ধ হয়ে স্মার্ট ফোনে লুডু খেলতেছে। অনেকে ছেলে মেয়ে গোল হয়ে আড্ডা দিচ্ছে।

আমি ভাবলাম একবার, সময় তো হল, স্যার কি আসবে না!
ব্যাগ থেকে দস্তয়ভস্কির “ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেণ্ট” বের করে পড়ব ভাবলাম। কিন্তু মনোযোগ দেয়ার কোন জো নেই। যে হল্লা চারিদিকে!

বইটা হাতে নিয়ে সেমিনারের দিকে গেলাম। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে ভালোই। অনেক ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে চলে এসেছে।

আমি সেমিনারে গিয়ে দেখলাম, সেখানেও একই অবস্থা। কেউ কেউ দলবদ্ধ হয়ে অ্যাসাইনমেণ্ট করছে, কেউ বা আড্ডা দিচ্ছে। আর সেমিনার রুমে যে কন্ট্রোলের দায়িত্বে, সেই বারান্দায় এককোণে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে ফুসুর ফুসুর করছে।

সেমিনারে সিট না পেয়ে অগত্যা ফিরে আসলাম। দেখলাম, রমজানকে হাসিখুশি দেখাচ্ছে।
— কি রে ছাতা পেলি?
— হ্যাঁ রে দোস্ত। সাদিক নিয়েছিল।
— যাক ভালোই হল।
— আচ্ছা আজকে ক্লাস হবে তো? সময় তো পেরিয়েই যাচ্ছে। রমজান উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইল।
— হবে তো বলল। কিন্তু কখন নিবে? এদিকে বৃষ্টিও বাড়ছে।

কথা বলতে বলতে আমরা ক্লাসরুমে কাছাকাছিই চলে আসলাম। ক্লাসরুমে না ঢুকে চললাম ওয়াশরুমের দিকে!

বর্ষাকালে যেন একটু বেশীই যেতে হয় আমাদের ঐ ঘরে!

এখানে ঐ ক্যান্টিনের মত অবস্থা। স্যাঁতসেঁতে, কাদা মাটীতে একাকার কুচকুচে মেঝে। একটা দুর্গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসছে। কতদিন এদিকে পরিচর্য্যা করা হচ্ছে না, কে জানে। তার ওপর অনেক ট্যাপ নষ্ট, লোটা বদনা তো আমি ভার্সিটি আসা অবধী দেখিনি। সবচেয়ে প্যাথেটিক হল, প্রায় সব টয়লেটের কমোড নষ্ট। জল জমে আছে। দুর্গন্ধ আর নোংরামি!

আমার খুব কষ্ট হয় কখনো কখনো। এই দেশের উচ্চশিক্ষার এগুলো হল সামগ্রিক চিত্র। অথচ একটা দেশের সবচেয়ে সুন্দর এবং মনোরম অবকাঠামো হওয়া দরকার বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাসপাতালের।


এই দেশে এ দুটোর অবকাঠামোই সবচেয়ে বেশী ভঙ্গুর।

জলবিয়োজন শেষে ভাবলাম, ক্লাসরুমে ঢুকব না। সোজা গিয়ে দাঁড়ালাম, নোটিশ বোর্ডের সামনে। দেখি, নোটিশ হলেও পড়ি।

চারিদিকে শিক্ষার্থী, কর্ম্মচারীদের আনাগোনা। তাদের হৈ হৈ চিৎকার চেঁচামেঁচি এবং দলবদ্ধ আড্ডা।

আমি নোটিশ বোর্ডের সামনে যখন দাঁড়ালাম, অদূরে থেকে কিছু ভাঙ্গা ভাঙ্গা শব্দ ভেসে আসতেছে। কিছুটা মনোযোগী হলাম।

বুঝলাম, চেয়ারম্যান মহোদয়কে একজন শিক্ষক অন্যজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিচার দিচ্ছে।
— স্যার, আমি গতকাল আমার বউকে নিয়ে ফেসবুকে ছবি দিয়েছিলাম। কিন্তু আব্বাস মিয়া আমার ছবিতে হা হা রিয়েক্ট দিয়েছে।

স্যারের কথাটা শুনে আমার হা হা করে হাসি পেল।

চেয়ারম্যান মহোদয় বলল— আপনি উনার ছবিতে হা হা রিয়েক্ট দিয়েছেন কেন?
আব্বাস মিয়া উত্তর দিল— স্যার আসলে ছবিতে তো রিয়েক্ট দিই নি। উনার ক্যাপশন পড়ে হা হা দিয়েছিলাম।
— না না স্যার। উনার বিয়ে হচ্ছে না দেখে, আমার বউকে তার সহ্য হচ্ছে না। তাই তিনি হা হা দিল। — কঠিন গলায় ঐ শিক্ষকটা বলল।

চেয়ারম্যান স্যার বলল— ক্যাপশন মানে? ক্যাপশনে কি ছিল?
আব্বাস মিয়া জবাব দেয়ার আগেই ঐ স্যার বলে ওঠল— স্যার ক’দিন আগে আমরা রাঙামাটী হানিমুনে গিয়েছিলাম। আমি ক্যাপশন দিলাম—
“দেখ চারিদিকে ঘাস আর ঘাস
আমার বুকের ভেতর তোমার বাঁশ”

তখন আব্বাস মিয়া বলে ওঠল— স্যার এখানে বাস’টা তিনি লিখেছেন ব চাঁদবিন্দু আকার তালব্য শ। তাই আমার হাসি পেল।
তখন ফিক করে চেয়ারম্যান মহোদয়ও হেসে ওঠল!

হঠাৎ দেখলাম, ব্যাগ কাঁধে নিয়ে আমাদের ব্যাচের অনেকেই সিঁড়ী বেয়ে নেমে যাচ্ছে।
— কি রে তোরা ক্লাস করবি না?
— ক্লাস হলেই তো করব। স্যারের চালের দোকানে নাকি পানি ওঠেছে। তাই আজ ক্লাস নিতে পারবে না।

বিরক্তিতে মনটা বিষিয়ে ওঠল। এই সকাল সকাল এত টাকা খরচ করে, এত ঝড়-ঝাপটা মাড়িয়ে আসলাম, এখন বলছে ক্লাস হবে না।

মনে মনে একটা গালিও দিলাম। “শালা, চাল বেচবি তো, বেচ। বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরী নিলি ক্যাঁ?”

ডিপার্টমেণ্ট থেকে বের হয়ে দেখলাম— এই বৃষ্টি বাদলেও মিছিল হচ্ছে। উপাচার্য্যের অপসারন নিয়ে মিছিল। সম্প্রতি টেন্ডারবাজিতে উপাচার্য্য মহোদয়ের দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। এবং রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক নিয়োগেও নাকি লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে।

ভাবলাম, মিছিলে কি যুক্ত হব? আবার এই উপাচার্য্য প্রতিদিন রাতে টেলিভিশনের টক শোতে গিয়ে জ্ঞানও বিলায়। অথচ ক’দিন আগে অনেক প্রাচীন কয়েকটা গাছ কেটে ফেলল। আমার ক্ষোভ মূলত ঐ কারণেই। প্রকল্পে দুর্নীতি হয় সেটা তো সর্ব্বজন বিবেচ্য। আর বৃষ্টি বাদলে মিছিল করা পাবলিকগুলো মূলত রাজনীতির চ্যালা। ভাগ পায়নি বলে চিল্লাচ্ছে।

এদিকে জিরো পয়েণ্ট আসতে আসতে শুনলাম— আমাদের যে স্যারের চালের দোকানের ব্যবসা, প্রায় কোটি টাকার চাল পানীতে ভিজে গেছে। ভেসে গেছে।

আমার ফিক করে হাসি পেল। আল্লাহ জানে, এই শোকে স্যার কতদিন পর ক্যাম্পাসে পা মাড়ায়!

উৎসর্গ— মোহাম্মদ তাহাছিনুল আবেদীন

 

 

 

রিজবাহ রিজবী
জন্ম—
কুতুবদিয়া, কক্সবাজার।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নরত। বর্ত্তমানে চট্টগ্রাম শহরে বসবাসরত …
Co- Founder
দিয়াশলাই অনলাইন বুকশপ।
মেইল: rijbahrizbi@gmail.com

 

 

প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ : মেহেরাজ হাসান শিশির

 

{যখন কিছুই ভাঙ্গছে না, চালের বস্তা ভাসছে তখন [বঙ্গীয় শব্দকোষ (শ্রী হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়), বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ ও ক্রিয়াভিত্তিক-বর্ণভিত্তিক ভাষাদর্শন (কলিম খান-রবি চক্রবর্ত্তী) অনুসৃত] চারবাক-এর বানান রীতিতে প্রকাশিত হল।
— সম্পাদকীয়}

শেয়ার করুন

মন্তব্য

টি মন্তব্য করা হয়েছে

Leave A Reply

শেয়ার